দেশীয় স্পিনিং ও প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের সুরক্ষায় নগদ সহায়তা ৫ শতাংশে উন্নীত, করপোরেট করহার ১২ শতাংশ নির্ধারণ, ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহালসহ ৬ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।

সংগঠনটির দাবি, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না দিলে দেশীয় শিল্প দুর্বল হয়ে তৈরি পোশাক খাত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে এবং এলডিসি-উত্তর সময়ে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব দাবি তুলে ধরে বিটিএমএ। সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল স্বাক্ষরিত লিখিত দাবি অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এতে বলা হয়, বিটিএমএর ১ হাজার ৮৮৩টি সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্পিনিং, উইভিং, ডেনিম, ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিংসহ বিভিন্ন বস্ত্রশিল্প রয়েছে। এ খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। আর তৈরি পোশাকসহ পুরো টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল ভ্যালু চেইনে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আরও পড়ুন

শিল্প ভালো না হলে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না: অর্থমন্ত্রী

সংগঠনটির ভাষ্য, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে এবং জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ। এছাড়া টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, প্যাকেজিং, হোম টেক্সটাইল, টেরি টাওয়েল ও সংশ্লিষ্ট ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবে প্রায় চার কোটি মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।

বিটিএমএ জানায়, দেশে তুলা উৎপাদন সীমিত হওয়ায় বিদেশ থেকে তুলা আমদানি করে সুতা উৎপাদন করতে হয়। এরপরও দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো নিট পোশাক শিল্পের প্রায় শতভাগ এবং ওভেন পোশাক শিল্পের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সুতার চাহিদা পূরণ করছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সুতা আমদানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় শিল্প অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে বলে দাবি সংগঠনটির। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে ২১ হাজার ১৪২ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে ভারত থেকে সুতা আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিটিএমএর মতে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ প্রধান বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন, রুলস অব অরিজিন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প দুর্বল হলে ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক রপ্তানিও ঝুঁকিতে পড়বে।

এ পরিস্থিতিতে সংগঠনটি ছয়টি নীতিগত দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানিতে প্রত্যাহার করা ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহাল।

দেশীয় সুতা ব্যবহারকারী রপ্তানিকারকদের জন্য বিদ্যমান ১ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ সহায়তা বাড়িয়ে কমপক্ষে ৫ শতাংশ করা। এছাড়া প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের করপোরেট আয়কর হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখা। পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (PSF), পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিনের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার।

আরও পড়ুন

অডিটের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, করদাতাদের সতর্ক করলো এনবিআর

নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার অথবা ৫ শতাংশ উৎসে করকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করা।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের ওপর নোটিশনাল সুদ সংক্রান্ত বিধান থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পকে অব্যাহতি দেওয়া।

বিটিএমএ আরও বলেছে, দেশীয় স্পিনিং ও প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প দুর্বল হয়ে পড়লে তৈরি পোশাক শিল্প আমদানিকৃত সুতা ও কাঁচামালের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এতে লিড টাইম বাড়বে, স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এ খাতে করা বিপুল বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এ কারণে জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং এলডিসি-উত্তর সময়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে সংগঠনটি।

এসএম/এমএমকে