‘আপনি খাদ্যমানব না?’

আচমকা প্রশ্ন শুনে আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। প্রশ্ন কমন পড়েনি, শুধু এ কারণে নয়। যে প্রশ্ন করেছে, তার দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরানো কঠিন।

মেয়েটা আবার বলল, ‘ফুডম্যান? আপনিই তো?’

আমি বিব্রত ভঙ্গিতে মাথা ওপর–নিচ করলাম। ফুড ব্লগার হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার বেশ পরিচিতি আছে। ফেসবুকে ফলোয়ার ছয় লাখের বেশি। ইউটিউবে সাবস্ক্রাইবার সাড়ে চার লাখ। রাস্তায়-রেস্তোরাঁয় প্রায়ই ভক্তদের সেলফি তোলার আবদার মেটাতে হয়। টুকটাক মোটিভেশনাল স্পিচও দিই নানা জায়গায়। কিন্তু এমন অপ্রস্তুত কখনো হইনি।

‘আপনার বিচার হওয়া উচিত। এত জঘন্য একটা চাওমিন আপনি ভালো বললেন কী করে?’ বলল মেয়েটা। টের পেলাম রেস্তোরাঁয় বসা লোকজন ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে। আমি নিজেকে সামলে নিলাম। হেসে সত্যি কথাটাই বললাম, ‘ওটা তো পেইড প্রোমোশন।’

মেয়েটা মনে হয় খুব অবাক হলো, ‘কিন্তু শুরুতে যে আপনাকে রেস্তোরাঁয় ঢুকতে দিচ্ছিল না? ভিডিও করতে দেবে না বলল...?’

আমি আমার ট্রেডমার্ক হাসিটা হাসলাম। ‘সবই স্ক্রিপ্টেড। একদম রিয়েলিস্টিক মনে হচ্ছিল, তাই না? আজকাল এটাই তো ট্রেন্ড। দিস ইজ নিউ এরা অব ডিজিটাল মার্কেটিং।’

মেয়েটার চোখেমুখে নিখাদ বিস্ময় খেলে গেল। জানলাম, ওর নাম সিলভি।

নেপালের আজব ফুল

এরপর সিলভির সঙ্গে প্রায়ই আমার দেখা হতে লাগল। কফিশপে, আইসক্রিম পারলারে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটালাম। ইনস্টাগ্রামে আমাদের ছবির নিচে কমেন্ট পড়তে লাগল: ‘নাইস কাপল’, ‘হাউ কিউট’, ‘ফুডানির পুত তোর এত প্রেম ক্যান...’, ইত্যাদি। দুই-একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে আমাদের নিয়ে খবরও বেরোল।

ভালোই চলছিল।

কিন্তু এই সুখ বেশি দিন সইল না। একদিন তুমুল ঝগড়া হলো আমাদের। রেস্তোরাঁর কোনার টেবিলে বসে আমরা চিৎকার করে একজন আরেকজনকে গালাগাল করলাম। পরদিনই সেই ঝগড়ার ভিডিওতে ছেয়ে গেল ফেসবুক, ইউটিউব।

ভীষণ ভেঙে পড়লাম আমি। নিজেকে মনে হলো মাংস ছাড়া তেহারি, েপটিহীন বার্গার। সিলভির ফেসবুক প্রোফাইল, ইনস্টাগ্রাম দেখে বুঝতে পারছিলাম, সে-ও ভালো নেই। ওর চোখের নিচে কালি পড়েছে। ফেসবুক পোস্টে লিখেছে, ‘So it’s true when all is said and done, grief is the price we pay for love.’

বিশ্বকাপ রঙ্গ

এই অসহ্য যন্ত্রণা আর ভালো লাগছিল না। ভাবছিলাম ওকে ফোন করব। সরি বলব। এরই মধ্যে একদিন আচমকা দেখি ইনস্টাগ্রামে ওর ছবি। ঝকমকে। হাসিখুশি। যেন ঝলমল করছে। আশ্চর্য! সিলভি কি অন্য কারও প্রেমে পড়ল?

পরদিন দেখলাম সে ছোট্ট একটা ভিডিও আপলোড করেছে। ভিডিওতে ‘সানশাইন’ নামের একটা ক্রিম মুখে মেখে হাসি হাসি মুখ করে বলছে, ‘এটা স্রেফ ক্রিমের চেয়ে বেশি কিছু। শুধু হতাশার দাগই নয়, হতাশাও মুছে দেয়...’ ইত্যাদি।

বড়লোকের মেয়ে দেখলেই যে প্রেম করতে হবে, এমন তো কথা নাই!

রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমি ওকে ফোন করলাম। ‘কী হচ্ছে এসব?’

সিলভি হাসল। বলল, ‘আরে বোকা। এটাকে বলে পেইড প্রোমোশন।’

‘তাহলে আমাদের রিলেশন? এত দিনের এত কিছু...?’

‘সবই স্ক্রিপ্টেড। একদম রিয়েলিস্টিক মনে হচ্ছিল, তাই না? আজকাল এটাই তো ট্রেন্ড। দিস ইজ নিউ এরা অব ডিজিটাল মার্কেটিং,’ বলতে বলতে সিলভি ওর ট্রেডমার্ক হাসিটা হাসল।