উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে উত্তরের চার জেলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুরে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি তীব্র আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে কয়েকশ পরিবার। কুড়িগ্রামের চিলমারীতে মাত্র ৩০ মিনিটে ২৫টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন নদীপারের মানুষ। গঙ্গাচড়ায় ঢলের পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গাইবান্ধায় ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা ও পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
কুড়িগ্রাম ও চিলমারী : চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের কয়েকটি স্থানে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বিশারপাড়া আশ্রয়ণ এলাকায় সোমবার ভোরে ৩০ মিনিটে ২৫টি বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। এ নিয়ে গেল তিন দিনে অন্তত ৫০টি পরিবার বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। এছাড়াও বৈদ্যুতিক লাইনের ছয়টি খুঁটি এবং কয়েকশ একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে মনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কড়াইবরিশাল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কড়াইবরিশাল বাজার, চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রসহ নানা স্থাপনা। বিশারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহিন মিয়া, তোফায়েল হোসেন ও মুকুল মিয়া বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ আমাদের বসতবাড়ি কেড়ে নিয়েছে। সাজানো সংসার হারিয়ে ফেলেছি। লাখ লাখ টাকার সম্পদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছি। ত্রাণ চাই না, চাই নদীভাঙন থেকে স্থায়ী রক্ষা। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, চরাঞ্চলের এত দীর্ঘ ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ জিও বস্তা দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। এজন্য ভাঙনের মুখে থাকা স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গাইবান্ধা : তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই। তীব্র স্রোতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার নদী শাসন প্রকল্পসহ অন্তত ৪১টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সাঘাটা উপজেলার বাস্তবায়নাধীন হলদিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর এলাকায় নদী শাসন প্রকল্পের ১ কিলোমিটার অংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ হয়েছে নিম্নমানের। বাঁধের পাশ থেকে বালু তুলে সিসি ব্লক তৈরি করে ডাম্পিং করা হয়েছে। নিয়ম না মেনে যেনতেনভাবে ব্লক বসানো হয়েছে। ফুলছড়ি উপজেলার খলাইহারা, পশ্চিম কঞ্চিপাড়া, বালাসীঘাট এলাকায় তিন দিনে অন্তত অর্ধশত বাড়িঘর, আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। চোখের সামনে কয়েকটি ঘর ও গাছ ভেসে যেতে দেখে নির্বাক হয়ে পড়েন এলাকার লোকজন।
অন্যদিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া, বেলকা, হারিপুরসহ তিন ইউনিয়নে চার-পাঁচ দিনে তিস্তার স্রোতে ভেঙে গেছে অন্তত ২ শতাধিক ঘরবাড়ি, বাড়ি ভিটা, আবাদি জমিসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, অন্তত ৫টি পয়েন্টে নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পানি বৃদ্ধির ফলে চরাঞ্চলের মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।
লালমনিরহাট : সোমবার ভোর থেকে দহগ্রামের ভাটিতে থাকা হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, ডাউয়াবাড়ি ও পাটিকাপাড়া, কালীগঞ্জের ভোটমারী, তুষভান্ডার ও কাকিনা, আদিতমারীর মহিষখোচা এবং সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ও রাজপুর ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পড়ে। এসব এলাকার পাট, বাদামসহ বিভিন্ন ফসলের খেত পানিতে ডুবে যায়। বেশ কয়েকটি এলাকায় অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জলমগ্ন হয়ে পড়ায় কয়েকটি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ ছিল। তবে সোমবার আবারো বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে তিস্তার পানি। এদিন বিকাল ৩টায় নদীর পানি বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।
গঙ্গাচড়া (রংপুর) : গঙ্গাচড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলোতে হু-হু করে ঢুকছে বন্যার পানি। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন নদী তীরবর্তী এলাকার হাজারো বাসিন্দা। সরেজমিন দেখা গেছে, আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে শতাধিক ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। বসতবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ওঠায় গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বানভাসি মানুষ। রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারে জ্বলছে না উনুন। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবারের সংকট। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় অনেকেই উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত এলাকায় শিশু এবং বৃদ্ধদের নিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, হঠাৎ করেই পানি বাড়তে থাকায় তারা আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ারও সময় পাননি। লক্ষিটারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, চরাঞ্চলের প্রায় ৩০০ পরিবার পুরোপুরি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নে ঢলের পানিতে ডুবে নাহিদ নামে সাড়ে চার বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুরে বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে সে পানিতে তলিয়ে যায়। চার বছর আগে পুকুরে ডুবে তার বড় ভাই নাজমুলের মৃত্যু হয়েছিল।
ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) : উপজেলার প্রধান নদী দুধকুমারের পানি বিপৎসীমার ২৪ সে.মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী অববাহিকার তিলাই ইউনিয়নের দক্ষিণ তিলাই ও দক্ষিণছাট গোপালপুর গ্রামের চার শতাধিক বাড়ি ঘরে পানি ঢুকেছে। পাইকেরছড়া ইউনিয়নের ছিটপাইকের ছড়া ও পাইক ডাঙ্গা, সোনাহাট ইউনিয়নের চরবলদিয়া, চর শতিপুরি, চর-ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের ইসলামপুর ও আন্ধারিঝাড় ইউনিয়নের চর বাড়ুইটারী, চরধাউরারখুটিসহ বেশকিছু চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দুধকুমার নদীপাড়ের বাসিন্দা হাসেম আলী বলেন, বাড়িতে পানি ওঠেছে, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি নিয়ে বিপদে আছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুকনো খাবার ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।








