আড়াই শ বছর আগে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এ দেশের প্রত্যেক মানুষ সম-অধিকারসম্পন্ন হবে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। কিন্তু তা পূরণের জন্য লড়াই থেকেও আমেরিকার মানুষ পিছিয়ে থাকেনি। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে আব্রাহাম লিঙ্কন, সেখান থেকে আজকের মামদানি, সেই লড়াইয়েরই অব্যাহত ধারা। লিখেছেন হাসান ফেরদৌস
১৭ সেপ্টেম্বর ১৭৮৭। ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমেরিকার শাসনতন্ত্র প্রশ্নে জাতীয় সম্মেলন। ঠিক কী চরিত্র হবে নতুন দেশটির—রাজতন্ত্র ফিরে আসবে, নাকি এক নতুন ধরনের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হবে?
১১৫ দিনের তর্ক-বিতর্ক শেষে সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। তাঁকে ঘিরে ধরল অপেক্ষমাণ দর্শকেরা। একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডক্টর, কী ঠিক হলো?’
বেন ফ্রাঙ্কলিনের জবাব, ‘প্রজাতন্ত্র, তবে যদি আপনারা একে রক্ষা করতে পারেন।’
৪ জুলাই ২০২৬, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। ফ্রাঙ্কলিনের সেই সতর্কবার্তা এখন আগের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক অর্থবহ।
এই আড়াই শ বছরে আমেরিকা অনেক চড়াই-উতরাই দিয়ে গেছে। গৃহযুদ্ধ, নাগরিক অধিকারের লড়াই, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ৯/১১, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ।
কিন্তু কখনোই এই দেশ গণপ্রজাতান্ত্রিক হিসেবে টিকে থাকবে কি না, এমন কোনো সন্দেহ জাগেনি। এখন জাগছে, কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প যেভাবে দেশ শাসন করতে চাইছেন, অনেকে তাকে রাজতান্ত্রিক বা ‘ইম্পেরিয়াল’ নামে অভিহিত করেছেন।
ফরাসি সম্রাট ১৪তম লুই বলেছিলেন তিনিই রাষ্ট্র। অর্থাৎ তিনি যা বলবেন, তা–ই আইন। ট্রাম্প ঠিক তা–ই চাইছেন। কোনো আইন, কোনো প্রচলিত নিয়ম নয়, নিজের কাছে যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই আইন, এ তাঁর নিজের কথা।
এমন ঘটতে পারে, সে বিপদ বিষয়ে ১৯৭৩ সালে সাবধান করেছিলেন ঐতিহাসিক আর্থার স্লেসিঞ্জার। তিনি এই ভেবে ভীত ছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ক্রমে এত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন যে তাঁদের সঙ্গে ফরাসি সম্রাটের বড় কোনো ফারাক নেই।
‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’ কথাটা তখন থেকেই শোনা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহারে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রসঙ্গেই কথাটা ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ‘ইম্পেরিয়াল’ প্রেসিডেন্সি সত্যি সত্যি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে লন্ডভন্ড করে দেবে, এ কথা সম্ভবত কেউ ভাবেনি।
মার্কিন তরুণ ইহুদিরা যেভাবে জায়নবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেনসেই ভয়ের কথাই বলেছেন নিউইয়র্ক টাইমস–এর ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথান সোয়ান। তাঁদের নতুন বই রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাতে কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নন, তিনি সর্বময় ক্ষমতাধর এক রাজা। তিনি নিজে তা–ই মনে করেন, পৃথিবীও এখন তাঁকে সেভাবেই দেখছে।
আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিনে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সামনে যে প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, একজন সর্বক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট, না দেশের শাসনতন্ত্র—কে এই দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে?
‘পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল নগরী’
প্রেসিডেন্ট রিগ্যান বলেছিলেন, আমেরিকা হচ্ছে পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল এক নগরী। ১৯৮৯ সালে তাঁর বিদায়ী ভাষণে তিনি এই আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ধনজনে ও শৌর্যে সবার সেরা এই দেশ পৃথিবীর মুক্তিপ্রত্যাশী সব মানুষের জন্য একটি ‘খোলা গৃহ’।
আমেরিকা যে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ, এ কথায় কোনো সন্দেহ নেই। তার গণতান্ত্রিক ভিত্তিও সবচেয়ে পুরোনো। মুক্তি ও প্রাচুর্যের আশায় পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ এ দেশে পাড়ি জমিয়েছে। নিজের দেশে কথা বলার অধিকার হারিয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ।
কিন্তু সেই আলোকোজ্জ্বল নগরীর সব বাসিন্দা সমান অধিকার ভোগ করে না। ১৭৭৬ সালে নয় যেমন, তেমনি এখনো নয়।
মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলবিরোধী শক্তির উত্থানইংরেজের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে সাড়ম্বরে যে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ জারি করা হয়, তাতে বলা হয়েছিল ঈশ্বরের সৃষ্ট সব মানুষই সমান। অথচ বেন ফ্রাঙ্কলিন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের দেনদরবারের পর যে শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়, তাতে দেশের লাখ লাখ কৃষ্ণকায় মানুষকে বড়জোর তিন-পঞ্চমাংশ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
১৮৬৫ সালে শাসনতন্ত্রের ১৩তম সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও কালো ও বাদামি মানুষেরা দেড় শ বছর পরেও পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক নয়।
আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কালো মানুষেরা এ দেশের সবচেয়ে অনগ্রসর ও দরিদ্র। প্রতি চারজন কালো শিশুর একজন অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার। প্রতি চারজন কৃষ্ণকায় পুরুষের একজন তাদের জীবদ্দশায় একবারের জন্য হলেও জেলে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য মাত্র ৩৫ বছরেই কেন শেষকমবেশি একই রকম বৈষম্যের শিকার অশ্বেতকায় অভিবাসীরা। যাদের শ্রম ও মেধায় আমেরিকা বিশ্বে এখন এক নম্বর, তাদের অনেকেই অশ্বেতকায় অভিবাসী। অথচ চলতি মার্কিন প্রশাসনের চোখে কালো অথবা বাদামি এসব অভিবাসী মার্কিন সভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। যেভাবে পারো এদের খেদাও, চলতি মার্কিন প্রশাসনের এটাই এখন মন্ত্র।
আমেরিকার জনসংখ্যা ক্রমে অশ্বেতকায়-প্রধান হয়ে উঠছে, শ্বেতকায়দের ভীতির সেটাই প্রধান কারণ। বস্তুত, চলতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধরন অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ দেশটির জনসংখ্যার বৃহদংশ হবে অশ্বেতকায়।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই ভয় এ দেশের শ্বেতকায় প্রভুদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই।
এই উদ্বিগ্ন শ্বেতকায়দের কণ্ঠস্বর হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দল। ২০১৭ সালে ভার্জিনিয়ার শারলটসভিলে জ্বলন্ত মশাল হাতে বর্ণবাদী মিছিলে স্লোগান ছিল, ‘ইউ উইল নট রিপ্লেস আস।’ এই ‘ইউ’ হচ্ছে বহিরাগত অশ্বেতকায়। ‘এদের মধ্যে অনেক ভালো মানুষ রয়েছে,’ এমন সাফাই গেয়েছিলেন ট্রাম্প।
বিভক্ত আমেরিকা
আমেরিকার এই রাজনৈতিক মেরুকরণকে যা আরও তীব্রতর করেছে, তা হলো সম্পদের বৈষম্য। তার ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই আমেরিকায় সম্পদ বা অধিকার প্রশ্নে সমতা ছিল না। তবে পরিশ্রম করলে একটা পর্যায় পর্যন্ত ওঠা যায়, এ কথা সত্য ছিল। এখন আর নয়।
আমেরিকা হয়তো এখনো বিশ্বের সেরা দেশ; কিন্তু সেটা কেবল তাদের জন্য যারা ধনী ও ক্ষমতার ভাগীদার। দেশের মাত্র এক শতাংশের হাতে এখন মোট জাতীয় সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ। মাত্র এক ডজন অতিধনীর হাতে রয়েছে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে অধিক সম্পদ, যা বিশ্বের সব উন্নয়নশীল দেশের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। এদের হাতে শুধু সব সম্পদ নয়, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতাও।
একদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অন্যদিকে সম্পদের পাহাড়সমান বৈষম্যের কারণে অনেক আমেরিকানই নিজের দেশ বিষয়ে হতাশ।
গ্যালপের এক জনমত জরিপ অনুসারে, মাত্র ৩৩ শতাংশ আমেরিকান নিজের দেশ নিয়ে ‘অত্যন্ত গর্বিত’। ‘গর্বিত নয়’ এমন মানুষের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে, বিশেষত যাদের বয়স ৩০-এর নিচে। এই বয়সের ৯০ শতাংশই মনে করে, আমেরিকার চলতি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত তাদের বিপক্ষে।
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের ৫৩ শতাংশ মানসিক রোগের শিকার। ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, এ কারণে কোনো দিনই তারা গৃহের মালিক হবে না, এ কথা মনে করে এই বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন।
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন যেভাবে দুর্বলকে শক্তিশালী করে তুলেছেমামদানির বিদ্রোহ
হতাশ হলেও এ দেশের তরুণ-যুবকেরা হাল ছেড়ে দেয়নি। এই প্রজন্মের সদস্যদের একটা বড় অংশ বলছে, দেশটিকে ফিরে পেতে লড়াইয়ের জন্য তারা প্রস্তুত। আর এই লড়াইটা হবে মূলত রাজনৈতিক।
বিদ্রোহ বা প্রত্যাখ্যান, যা–ই বলি না কেন, তার সবচেয়ে লক্ষণীয় প্রকাশ ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নগরী নিউইয়র্কে। এই শহরের মেয়র বা নগরপিতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জোহরান মামদানি, যেটা প্রচলিত শ্বেত রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রতি এক চপেটাঘাত।
মামদানি শুধু একজন অভিবাসী বা বহিরাগতই নন, তিনি অশ্বেতকায় ও মুসলমান। ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য হলেও নিজেকে তিনি একজন ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেন।
এই দলেরই উপদল হিসেবে গড়ে উঠেছে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা, যারা বাছাইপর্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনে যে অভাবিত সাফল্য দেখিয়েছে, অনেকেই তাকে রাজনৈতিক ভূমিকম্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ট্রাম্প মামদানি ও তাঁর অনুসারীদের ‘কমিউনিস্ট’ বলে গাল দিয়েছেন। কিন্তু নামের আগে কোনো লেবেল নিয়ে তাঁরা মোটেই উদ্বিগ্ন নন।
মামদানি বলেছেন, ‘সরকারের কাজ তার নাগরিকদের অধিকার, স্বাচ্ছন্দ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ধনতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বুঝি না, আমরা শুধু সরকারকে ব্যবহার করে সেই কাজটাই করতে চাই।’
অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
আড়াই শ বছর আগে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এ দেশের প্রত্যেক মানুষ সম-অধিকারসম্পন্ন হবে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। কিন্তু তা পূরণের জন্য লড়াই থেকেও আমেরিকার মানুষ পিছিয়ে থাকেনি। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে আব্রাহাম লিঙ্কন, সেখান থেকে আজকের মামদানি, সেই লড়াইয়েরই অব্যাহত ধারা।
জন্মের ২৫০ বছর পর আমেরিকা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার সামনে দুটি পথ—একটি শ্বেতনির্ভর, বিভক্ত ও আগ্রাসী। অন্যটি উন্মুক্ত, বহুজাতিক ও জনকল্যাণমুখী।
কোন পথে যাবে সে?
হাসান ফেরদৌস সাংবাদিক
মতামত লেখক নিজস্ব






