সৌদি আরবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে উপার্জন করা অর্থ পরিবারের কাছে পাঠানোর কথা। অথচ টিকটকে পরিচয়ের পর প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে প্রায় তিন বছরে সেই অর্থের ১২ লাখ টাকা এক নারীর কাছে পাঠিয়েছেন বরিশালের মুলাদীর সৌদি প্রবাসী মোস্তাক আহমেদ (৪০)। পড়াশোনার খরচ ও স্বজনদের অসুস্থতার কথা বলে ওই নারী ধাপে ধাপে টাকা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা নেওয়ার পর গত এক মাস ধরে তাঁর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
সর্বস্ব হারানোর পর এখন সৌদি আরবেও চরম বিপাকে পড়েছেন মোস্তাক আহমেদ। তাঁর অংশীদারত্বের খাবারের হোটেল ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে শেষ হয়েছে আকামার মেয়াদও। নতুন কাজ না থাকায় আয়-রোজগার বন্ধ। এমনকি দেশে ফেরার বিমান টিকিট কেনার টাকাও নেই। পরিবারও ধারদেনায় জর্জরিত হওয়ায় তাঁকে অর্থ সহায়তা করতে পারছে না। ফলে দেশে ফেরার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন এই প্রবাসী।
মোস্তাক আহমেদ মুলাদী উপজেলার বাটামারা ইউনিয়নের চরবাটামারা গ্রামের বাসিন্দা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতিতে দেশে ফেরেন মোস্তাক। পরে ২০২২ সালে আবার সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে এক প্রবাসী বাংলাদেশীর সঙ্গে অংশীদারত্বে একটি খাবারের হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। ২০২৩ সালে টিকটকে ‘নুসরাত সেতু’ নামে এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই নারী নিজেকে নার্সিংয়ের ছাত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মোস্তাকের অভিযোগ, পরিচয়ের পর থেকেই নুসরাত বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে তাঁর কাছে টাকা চাইতে থাকেন। কখনো পরিবারের অসহায়ত্ব, কখনো নিজের পড়াশোনা, আবার কখনো স্বজনের অসুস্থতার কথা বলে টাকা নিতেন তিনি। নার্সিং পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার পর সব টাকা ফেরত দেবেন এবং তাঁকে বিয়ে করবেন—এমন আশ্বাসও দেওয়া হতো।
এসব কথায় বিশ্বাস করে গত প্রায় তিন বছরে বিভিন্ন সময়ে ধাপে ধাপে প্রায় ১২ লাখ টাকা পাঠান মোস্তাক। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারীর দেওয়া একটি বিকাশ অ্যাকাউন্টে এসব টাকা পাঠানো হয়।
তবে গত প্রায় এক মাস ধরে নুসরাত সেতুর সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার—সব মাধ্যমেই যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে বলে দাবি মোস্তাকের।
মোস্তাকের স্ত্রী লিলি বেগম জানান, ‘অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্কের তিনি আমাদের সংসারে টাকা দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেন। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছি। এখন শুনছি, ওই নারীও যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। কাজ না থাকায় মোস্তাক দেশে ফিরতে চান এবং বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতে বলেন। কিন্তু আমরা নিজেরাই যেখানে কষ্টে আছি, সেখানে সৌদিতে তাঁর জন্য টাকা পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না।’
মোস্তাকের পরিবারের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাঁকে আবেগ ও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। হারানো অর্থ ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছেন মোস্তাক আহমেদ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুলাদী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—বিশেষ করে টিকটক, ফেসবুক ও ইমোর মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রবাসীদের হানিট্র্যাপে ফেলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। আবেগ ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ভুয়া পরিচয় কিংবা অন্যের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কারও সঙ্গে পরিচয়ের পর আবেগের বশে বা যাচাই-বাছাই ছাড়া আর্থিক লেনদেন করা উচিত নয়। ওই পরিবারটির কাছে টাকা পাঠানোর প্রমাণ থাকলে তাঁরা সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেন।








