চা বাগান ছিল এবং হয়তো থাকবে। কিন্তু বাগানীদের জীবনব্যবস্থা আগামীতে কেমন হবে তা বলা মুশকিল। এমনটিই মনে করেন উপমহাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত চা বাগান মালনীছড়ার চা-কন্যা সুমি মোদী। তিনি জানান, আমাদের চা পাতা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে আমাদের অধিকারের স্বীকৃতি কতদূর তা বলা কঠিন। চা শ্রমিকরা অত্যন্ত সহজ-সরল। তারা খোদ নিজ অধিকারের ব্যাপারেই উদাসীন। ফলে বরাবরই অন্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় সব ক্ষেত্রে তারা বঞ্চিত। প্রতিযোগিতার এ যুগে তারা এগোতে পারছে না। উদাসীনতা ও দৈন্যতার কারণে তারা শিক্ষা থেকেও এখনো প্রায় বঞ্চিত। তারা বরাবরই পিছিয়ে রয়েছে। এখানে আর্থিক সংকট তো আছেই। সেইসঙ্গে মন-মানসিকতার দৈন্যতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটও রয়েছে। এমন অবস্থায় চা শ্রমিকের সন্তান হিসাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হতেই হয়। আর এই কারণেই পড়াশোনার পাশাপাশি হাতের কাজ শেখা। এর সঙ্গে উৎপাদন, প্রচার ও বিপণন জড়িত। তাই অনেকটা একা একাই এসব শিখছেন সুমি। এখন তিনি ধীরে ধীরে সফলতা ও সম্ভাবনার আলো দেখছেন। সুমি বর্তমানে সিলেট সরকারি মুরারীচাঁদ কলেজে ডিগ্রিতে পড়ছেন। শুধু পড়াশোনাই তার কাজ নয়। পড়াশোনার বাইরে কাপড় কেনা, সেসব ডিজাইন ও প্রিন্ট করা নিয়ে দিনভর ব্যস্ত থাকেন তিনি। শাড়ি, ব্লাউজ, পাঞ্জাবি ও ফতুয়া কিনে তাতে হ্যান্ড প্রিন্ট করেন। এর চাহিদাও বেশ। এসব থেকে যা আয় হয় তা দিয়েই নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তার এ কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই পথের পথিক হয়েছেন আরও অনেক বেকার মেয়ে ও নারী। এমনকি একটি ছোট্ট শিশুও খেলার ছলে ক্লে দিয়ে চমৎকার রুচিবোধের ডিজাইন করছে। সে সুমির কাজের অনুকরণ ও অনুসরণ করছে। সুমির প্রত্যাশা, কাজ ভালো করে শিখে একজন সৃজনশীল ও সফল উদ্যোক্তা হওয়া। শিক্ষাবঞ্চিত থেকে শুরু করে চাকরিবঞ্চিত উচ্চশিক্ষিতদের তিনি সম্পৃক্ত করতে চান। যার যার দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দিতে চান। তারপরও প্রত্যাশা ও স্বপ্নের মাঝে হতাশার মেঘ ছেয়ে ফেলে কখনো কখনো। এর পেছনে প্রথমত প্রয়োজনীয় ট্রেনিং করার সুযোগ না পাওয়া এবং দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক সংকট দায়ী।

সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভানেত্রী লুবনা ইয়াসমিন শম্পা বলেন, ‘সংগঠনের কার্যক্রম পূর্বে নগর-শহর কেন্দ্রিক ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রত্যন্ত এলাকা ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করছি। যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে কুটির শিল্পের দক্ষ কারিগর হতে উদ্বুদ্ধ করা এবং উদ্যোক্তা তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।’

তিনি মনে করেন, রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর উৎপাদন মানসম্পন্ন করতে হলে মাঠপর্যায়ের কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। উদ্যোক্তা হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কাজ জানা-বোঝা দরকার। পণ্যের অনলাইন-অফলাইন প্রচার-প্রসার এবং অর্থের সংস্থান বিষয়ক নিয়মকানুন জানাও দরকার। চেম্বারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৭-৮টি ট্রেনিং করানো হয়েছে। ট্রেনিংয়ের পরও তাদের কর্মকাণ্ড তদারকি করা হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় প্রশিক্ষণের পর কারিগরদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, উপকরণ ও যন্ত্রপাতি দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, সিলেটের মণিপুরীদের বস্ত্রশিল্প ও শীতলপাটিসহ আরও অনেক কিছুই জিআই পণ্য। আন্তর্জাতিক পণ্য মেলায় গিয়ে সিলেটের মণিপুরী হস্তশিল্প, হ্যান্ডক্রাফট, নকশিকাঁথা ও শীতলপাটির কদর ও চাহিদা দেখে গর্বিত হয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের লেগে থাকতেই হবে। বিশ্ববাসীকে আমাদের পণ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই হবে। এ অঞ্চলের নারীরা কুটির শিল্পকে তুলে ধরছেন বিশ্বমঞ্চে। প্রতিকূলতা জয় করে এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে। তবেই সফলতা আসবে বাংলাদেশের।’

স্থানীয় প্রশাসন, সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং সংশ্লিষ্ট নারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর সিলেটের চার জেলায় বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার নারী উদ্যোক্তা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। এর মধ্যে বুটিকস, হস্তশিল্প, আচার শিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী হস্তশিল্প ও শীতলপাটির মতো কুটির শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা নারীর সংখ্যা সিলেট জেলাতেই প্রায় ৩ হাজার। বাকি ৩ হাজারের অবস্থান মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলায়।

নগরের যান্ত্রিক জীবন পেরিয়ে এবার নজর দেওয়া যাক প্রত্যন্ত এলাকার কুটির শিল্পের দিকে। এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়। এটি ২০০০ সাল থেকে বিশ্বস্বীকৃত রামসার সাইট। সরকার ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে। ২০০ প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর টাঙ্গুয়ায় রয়েছে ১৪০ প্রজাতির মাছ। এই টাঙ্গুয়ার তীরবর্তী গ্রাম জাঞ্জাইল। এর চারদিকেই পানি। বাসিন্দাদের চলাচল নৌকায়। সেই গ্রামের বাসিন্দা প্রীতি রাণী কর জিআই পণ্য শীতল পাটির এক অনন্য কারিগর ও উদ্যোক্তা। কিন্তু পুঁজির সংকটে তিনি এগিয়ে যেতে পারছেন না। একা পুঁজির জোগান দিতে না পারায় হতদরিদ্র আরও ৫০ জনকে নিয়ে সমিতি করেছেন তিনি। ফোনে কথা বলার সময় তিনি জানালেন, বিশ্বস্বীকৃতি পাওয়া শীতল পাটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ খুলে দিয়েছে। এজন্য আগায় নয়, আমরা যারা গোড়ায় আছি সেখানে জল ঢালা জরুরি। শিকড়ে উৎপাদন না হলে বিদেশে রপ্তানি হবে কীভাবে? তিনি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

অন্যদিকে, সর্বোচ্চ লেখাপড়া শেষ করে সিলেটের মোছাম্মৎ সাজনারা বেগম এখন একজন শিক্ষিকা। নির্ভীক নারী উদ্যোক্তা হিসাবে তিনি জাতীয়ভাবে পুরস্কারপ্রাপ্ত। বর্তমানে তিনি কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘নান্দনিক সিলেট’-এর কর্ণধার। কাজ শেখা ও উদ্যোক্তা হওয়ার তালিম নিতে তার কাছে ভিড় করেছেন আরও প্রায় অর্ধশত নারী। উদ্যোক্তা সাজনারার বেশ কিছু পণ্য বিএসটিআই অনুমোদিত। বেশ কিছু পণ্য বিদেশেও যায়। তিনি জানান, প্রায় ২০টি পণ্যের মধ্যে তার হরেক রকমের আচার বেশ আলোচিত। আচারের পাশাপাশি শীতল পাটি ও মণিপুরী শাড়িসহ আরও অনেক পণ্যের সমাহার রয়েছে তার প্রতিষ্ঠানে।

দক্ষ কারুশিল্পী থেকে অল্পদিনে আলোচিত উদ্যোক্তা হয়েছেন সুইটি সূত্রধর। তিনি ‘এসএস গ্যালারি ক্রাফট’-এর কর্ণধার। নিজের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি এখন তিনি নগরী ও প্রত্যন্ত এলাকার নারী কারুশিল্পীদের গাইডের মতো হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। আবার মণিপুরী হস্তশিল্পের উদ্যোক্তা নিন্দিয়া সিনহা। সিলেটের ‘ফিজেত’ নামের প্রতিষ্ঠানে রয়েছে মণিপুরী হস্তশিল্প ও বস্ত্রশিল্পের এটুজেড কালেকশন। অনলাইন ও অফলাইনে সমানতালে চলছে তার ব্যবসা।

সিলেটের মণিপুরী বস্ত্রশিল্প ও শীতল পাটির মতো জিআই পণ্যগুলো বর্তমানে কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও মানসম্মত সুতার সংকটে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেইসঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও রয়েছে। কাঁচামাল বা মূর্তা গাছের সংকটের কারণে শীতলপাটি শিল্প হুমকির মুখে পড়েছিল। এখন বন বিভাগ রাতারগুল জলাবনসহ বিভিন্ন পতিত নিচু জমিতে বাণিজ্যিকভাবে মূর্তা বনায়নের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিসিক কারিগরদের আর্থিক ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মূর্তা চাষে উৎসাহিত করছে। অন্যদিকে, মণিপুরী তাঁতশিল্পের ক্ষেত্রে বাজারে ভালো মানের সুতা বা রং নেই। দূরবর্তী স্থান থেকে চড়া মূল্যে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয় প্রান্তিক কারিগরদের। বিপণনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট। যার ফলে লভ্যাংশের বড় অংশই কারিগরদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বা বিসিকের অধীনে স্থানীয় পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় ‘সুতা ব্যাংক’ স্থাপনের দাবি কারিগরদের। পাশাপাশি জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ বা এসএমই অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে কারিগরদের ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং বড় বড় রিটেইল চেইনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা জরুরি। হস্তশিল্পের গুণগতমান নিশ্চিতে কিউআর কোড বা হলোগ্রামযুক্ত জিআই ট্যাগ ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।