আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার কর্মী আমেনা বেগমের মৃত্যুর প্রায় তিন মাস পর বিষয়টি জানতে পারে তার পরিবার। এর মধ্যে পরিবারের কাউকে না জানিয়েই তার মরদেহ দাফন করা হয়। এ ঘটনাকে আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যা দাবি করে স্বামী মো. অলিউল্লাহ ওরফে শহিদের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা করেছেন আমেনার বোন মোসা. রুবিনা বেগম। তার পরিবারেরই কেউ এ ঘটনাকে আত্মহত্যা মানতে নারাজ।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তাজুল ইসলাম সোহাগের আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) সাত দিনের মধ্যে এ ঘটনায় আগে কোনো মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত অলিউল্লাহ: ছবি সংগৃহীত
বাদীপক্ষের আইনজীবী মীর আলমগীর হোসেন বলেন, আদালত মামলার আবেদন আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন।
আরও পড়ুনবিয়ের পর থেকেই আমার বোনকে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়। তিন মাস কোনো খোঁজ না পেয়ে যখন খুঁজতে বের হই, তখন জানতে পারি সে মারা গেছে। আমাদের কাউকে না জানিয়েই মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
চিকিৎসক ধীপ্রার মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের নির্দেশ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আমেনার প্রথম বিয়ে হয়। পরের বছর লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তার প্রথম স্বামী মারা যান। তখন তার কোলে ছিল দুই মাস বয়সী একটি সন্তান। পরে জীবিকার প্রয়োজনে ২০২৪ সালের এপ্রিলে আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার আমার স্পিনিং মিলস লিমিটেডে চাকরি নেন তিনি। একই প্রতিষ্ঠানে কাজের সুবাদে অলিউল্লাহ ওরফে শহিদের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং বছরের শেষ দিকে তাদের বিয়ে হয়।
আদালতে মামলা করেছেন আমেনার বোন রুবিনা: ছবি জাগো নিউজ
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই শহিদ নিয়মিত আমেনার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। একপর্যায়ে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না। মাঝে মধ্যে স্বামীর অগোচরে তার ফোন ব্যবহার করে আমেনা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং নিজের দুর্দশার কথা জানাতেন।
আরও পড়ুন
আসল গয়নার বদলে নকল রাখার অভিযোগ, দুই নারী ৫ দিনের রিমান্ডে
রুবিনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই আমার বোনকে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়। তিন মাস কোনো খোঁজ না পেয়ে যখন খুঁজতে বের হই, তখন জানতে পারি সে মারা গেছে। আমাদের কাউকে না জানিয়েই মরদেহ দাফন করা হয়েছে।’
পরিবারের সদস্যদের খুঁজে না পেয়ে পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা করে এবং পরে শিমুলতলার দরগাপাড়া কবরস্থানে আমেনার মরদেহ দাফন করে। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর শহিদ পলাতক রয়েছেন।
রুবিনা বেগম অভিযোগ করেন, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে আমেনার সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মে মাসের শেষ দিকে নতুন বাসার সন্ধান পেয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, গত ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় আমেনার মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য ছিল, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে ঘটনার পর থেকেই শহিদকে আর এলাকায় দেখা যায়নি।
নিম্ন আদালত: ছবি জাগো নিউজ
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলেও আমেনাকে মারধর করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, নির্যাতনের একপর্যায়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে ঘটনাটি উপস্থাপন করা হয়।
আরও পড়ুন
আশুলিয়ায় নারীর মৃত্যুর ৪ মাস পর স্বামীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা
এজাহারে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের খুঁজে না পেয়ে পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা করে এবং পরে শিমুলতলার দরগাপাড়া কবরস্থানে আমেনার মরদেহ দাফন করে। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর শহিদ পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া আমেনার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও প্রায় দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কারও তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন।
বাদীর অভিযোগ, সহযোগিতা মেলেনি থানায়
মামলার বাদী ও নিহত আমেনা বেগমের বোন রুবিনা বেগম জাগো নিউজকে আরও জানান, বোনের মৃত্যুর খবর জানার পর পরিবারের সদস্যরা আশুলিয়া থানায় গেলেও কোনো সহযোগিতা পাননি। তার অভিযোগ, সেদিন রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত থানায় অবস্থান করেও প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে শুধু শহিদের নাম ছিল। ঠিকানা বা অন্য কোনো তথ্য ছিল না। বারবার থানায় গিয়ে পোস্টমর্টেমের তথ্য চেয়েছি, কিন্তু সহযোগিতা পাইনি। পরে অনেক চেষ্টা করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করি। এরপর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমার বোনকে জামগড়া শ্যামলতলা দরগাহপাড় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
আমরা আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাই। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক এবং যারা আমার বোনের মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
রুবিনা বেগমের অভিযোগ, আমেনার স্বামী অলিউল্লাহ ওরফে শহিদ পুলিশকে জানিয়েছিলেন, আমেনার কোনো স্বজন নেই এবং তার বাবা মারা গেছেন। অথচ তখন তাদের বাবা জীবিত ছিলেন। এসব ভুল তথ্যের কারণেই পরিবারের কাছে খবর পৌঁছায়নি বলে তার দাবি।
আরও পড়ুন
দেনমোহর আদায়ে নীতিমালা তৈরিতে নির্দেশ কেন নয়, জানতে চান হাইকোর্ট
এ ছাড়া রুবিনা বেগমের অভিযোগ, শহিদ একসময় তাকে বলেছিলেন, এ ঘটনায় তার ‘অনেক টাকা খরচ হয়েছে’। আমেনার প্রায় দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কারও তিনি নিজের কাছে রেখে দেন। পরে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দিয়ে গয়না ফেরত দেওয়ার কথা বললেও মামলা হওয়ার পর আর কোনো যোগাযোগ করেননি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রুবিনা। তার ভাষ্য, বর্তমান প্রযুক্তিতে একজন ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও পুলিশ পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। অথচ আমেনার কর্মস্থল ও ব্যক্তিগত নথিতে পরিবারের তথ্য ছিল।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘আমরা আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাই। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক এবং যারা আমার বোনের মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।’
অন্যদিকে অভিযুক্ত শহিদ কিংবা তার পরিচিতজনদের সন্ধান পাওয়া না যাওয়ায় আসামি পক্ষের কোনো মন্তব্য জানা যায়নি।
এমডিএএ/এসএইচএস








