ছোটবেলায় শিখেছি, পানির অপর নাম জীবন। যেহেতু পানি ও জীবন সমার্থক, সেহেতু আমাদের মানতে হবে পানি এক অমূল্য সম্পদ। বেঁচে থাকার জন্য পদে পদে পানির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। পানি তৃষ্ণা মেটায়, ফসলের মাঠকে সিক্ত করে, নানারকম শস্য ও সবজি উৎপাদিত হয়। পানিপথে পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য সক্রিয় করে তোলে, পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের জন্য পানি অপরিহার্য, পানিতে জন্মে ও বিচরণ করে এমনসব প্রাণী মানুষের খাদ্যে মূল্যবান আমিষের সংযোগ করে।
প্রবহমান পানি শিল্প-সংস্কৃতির নিত্য সহচর, ফোরাত নদীর পথ আটকে রেখে কারবালার ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়েছিল, শিল্পকারখানায় তাপ নিয়ন্ত্রণ ও বয়লার চালানোর জন্য পানির দরকার হয়, এভাবে বলতে গেলে পানি আমাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। পানির ব্যবহার বহুবিধ এবং বহুমাত্রিক। এ আলোচনার পর বুঝতে কষ্ট হবে না পানি কেন অমূল্য সম্পদ।
পানি নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে এমন একটি কথা চালু আছে। একটি রাষ্ট্র যখন অন্য একটি রাষ্ট্রে পানির প্রবাহ রুদ্ধ করে দেয়, তখন সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এ বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে সশস্ত্র সংঘাত এড়ানো কঠিন হয়ে ওঠে। বুট্রোস বুট্রোস ঘালি ছিলেন একজন প্রখ্যাত মিসরীয় কূটনীতিক। তিনি মিসরের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি পরলোকগমন করেন। বুট্রোস বুট্রোস ঘালি মন্তব্য করেছিলেন, মিসরের জাতীয় নিরাপত্তা নির্ভর করে নীল নদের পানির প্রবাহের ওপর। নীল নদের সর্বশেষ ভাটির দেশ হলো মিসর। মিসরের কৃষি ও নৌপরিবহণ মিসরের ওপর নির্ভরশীল। নীল নদ ভিক্টোরিয়া হ্রদ থেকে উৎপত্তি লাভ করে আফ্রিকার কয়েকটি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিসরে প্রবেশ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই মিসর এই নদীর উজানে পানি প্রত্যাহার এবং পানির প্রবাহ রুদ্ধ করার বিরোধিতা করে আসছে। মিসর খুব সফলভাবে তার পানির ওপর অধিকার নিশ্চিত করেছে। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? সামরিক শক্তির দিক থেকে মিসর নীল নদের উজানের দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। মিসর তার সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করে চোখ রাঙিয়ে মিসরে নীল নদের প্রবাহ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি পানির অধিকার নিশ্চিত করতে নিছক কূটনীতির মারপ্যাঁচই যথেষ্ট নয়, সামরিক সক্ষমতাও এতে বিশাল ভূমিকা পালন করতে পারে। ইথিওপিয়া সরকারিভাবে মাল্টি বিলিয়ন ডলার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম চালু করেছে। মেগা ড্যামটি নীল নদের ওপর অবস্থিত। এ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো এবং আঞ্চলিকভাবে বিদ্যুৎ শক্তি রপ্তানির করার পরিকল্পনা নিয়ে এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ইথিওপিয়া। তবে এই ড্যাম বা বাঁধ চালু করে এবং এর সংশ্লিষ্ট জলাধার ভরে ফেলে আঞ্চলিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে মিসর ও সুদানে। মিসর এ প্রকল্পটিকে তার অস্তিত্বের ওপর হুমকি মনে করে এবং এর ফলে সুপেয় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে বলে মত পোষণ করে। মিসর ইথিওপিয়াকে আহ্বান জানিয়েছে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসাবে শুষ্ক মৌসুমে পানি ব্যবস্থাপনা চুক্তিতে পৌঁছাতে। সুদান তার তরফ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে এ প্রকল্পের ফলে বন্যা দেখা দেবে এবং পানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। সুদান এক তরফাভাবে ড্যাম চালু করে নীল নদের প্রবাহে উঠানামা সৃষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। পৃথিবীতে একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি বণ্টনে কূটনৈতিক সমাধানেরও দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা মেকং নদীর পানিবণ্টন চুক্তির দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে পারি। মেকং নদীসংক্রান্ত চুক্তিটি বলবৎ আছে এবং সার্থকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। দানিয়ুব বিশ্বের সবচেয়ে আন্তর্জাতিক নদী। এই নদী অন্য যে কোনো নদীর চেয়ে বেশি দেশকে প্রভাবিত করে। এটি ১০টি দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দেশগুলো হলো জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, মলদোভা ও ইউক্রেন। দানিয়ুব রিভার প্রোটেকশন কনভেনশন অনুযায়ী এ নদীর পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই পানির ব্যবহার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করা হয় নদীটির পুরো অববাহিকাজুড়ে। ১৯৯৪ সালে স্বাক্ষরিত এ চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর দি প্রোটেকশন অব দানিয়ুর রিভারের মাধ্যমে। এছাড়া রয়েছে আরও বেশকিছু ঐতিহাসিক ও কার্যকর চুক্তি, যা নদীটিকে কেন্দ্র করে পূর্ণ আইনি কাঠামো প্রদান করে। দানিয়ুব নদীকে কেন্দ্র করে রয়েছে দানিয়ুব রিভার প্রোটেকশন কনভেনশন। এ চুক্তিটি সোফিয়াতে ১৯৯৪ সালে স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৯৮ সালে এটি কার্যকর হয়। এটা একটা মৌলিক পরিবেশবিষয়ক চুক্তি। এর ফলে দানিয়ুব অববাহিকার এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ১৪টি রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দূষণ প্রশমন, ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ এবং বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য। দ্বিতীয়ত কনভেনশন রিগার্ডিং দ্য রেজিম অব নেভিগেশন অন দ্য দানিয়ুর স্বাক্ষরিত হয়েছে বেলগ্রেডে ১৯৪৮ সালে। এই চুক্তি অনুযায়ী নদীর ওপর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ স্বাধীন এবং উন্মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে। এ ব্যবস্থা পরিচালনা করে আধুনিক দানিয়ুব কমিশন। প্রশংসার বিষয় হলো ইউরোপের ১৪টি দেশ দানিয়ুব নদী ব্যবহার নিয়ে সর্বসম্মতভাবে ২টি প্রধান চুক্তিতে পৌঁছেছে। অথচ বাংলাদেশ ভারতের মতো আধিপত্যবাদী ও সভ্যতা বিধ্বংসী রাষ্ট্রের প্রতিবেশী হওয়ার ফলে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে কোনো সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছাতে পারছে না। গঙ্গার পানি নিয়ে ৩০ বছর মেয়াদি যে চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানি পায়নি। বাংলাদেশের প্রমত্তা পদ্মা, যা গঙ্গারই বাংলাদেশি অংশ, আজ মৃতপ্রায়। শুষ্ক মৌসুমে যথার্থ পানি না থাকায় বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, মৎস্যসম্পদ এবং সর্বোপরি পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার একটি উপলব্ধিতে পৌঁছেছে যে, ভারতের শুভবুদ্ধির ওপর আদৌ ভরসা করা যায় না। এ পরিস্থিতিতে চিন্তা করা হচ্ছে অভ্যন্তরীণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। পদ্মা ব্যারাজের কাজ হবে বর্ষা মৌসুমের পানির প্রবাহ শুষ্ক মৌসুমের জন্য ধরে রাখা এবং সেই পানি দিয়ে কৃষিকাজ, মাছচাষ, নিশ্চিত করা। এছাড়া পদ্মার সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট নদীর পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করে সমুদ্র থেকে প্রবেশ করা নোনা পানির প্রবাহ উলটে দেওয়া। শুষ্ক মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। এর ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের অকার্যকর হওয়া গভীর নলকূপগুলো আবারও চালু করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিককালে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সীমান্তের ওপারে ভারতে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে নাখোশ। ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে তা ভারতের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। ভারতের আপত্তি চীনা প্রকৌশলী ও কলাকুশলীদের নিয়ে। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংকীর্ণ চিকেন নেকের কাছাকাছি চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে উত্তরপূর্ব ভারতকেন্দ্রিক ভারতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ ঘনীভূত হবে। আসল কথা ভারত চায় না বাংলাদেশ গণচীনের সহায়তায় মৃতপ্রায় তিস্তা নদীকে পুনরুজ্জীবিত করে। যে কোনো মূল্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একে জাতীয় অগ্রাধিকার আখ্যা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেছেন, দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের যে কোনো মূল্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। যে কোনো মূল্যে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের কথা বলে কার্যত তিনি ভারতের ভ্রুকুটিকে অগ্রাহ্য করেছেন। বাংলাদেশের সীমান্তের মধ্যে যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অধিকার রয়েছে বাংলাদেশের। কোনো তৃতীয় দেশের হস্তক্ষেপ এক্ষেত্রে কাম্য নয়। ভারত বাংলাদেশকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়নি বলে বাংলাদেশকে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এ অর্থ ব্যয় করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার চিন্তা করা হয়েছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে চীনের সাহায্যে। সে সময় ভারত এ নিয়ে বাগড়া দিলে বলা হয়েছিল যে, চীন ও ভারত এ মহাপরিকল্পনা যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এরপর ভারতের তরফ থেকে কোনো নড়চড় দেখা যায়নি। আসলে ভারত প্রযুক্তিগতভাবে এ ধরনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যোগ্যতা রাখে না। তদপুরি চীনের সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ভারত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, তা নয়াদিল্লি ঘুণাক্ষরেও মনে করতে পারছে না। ভারত বাংলাদেশকে তিস্তার পানি না দেওয়ায় বাংলাদেশ চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো ভারতের একগুঁয়েমি ও আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী অবস্থানের ফলে বাংলাদেশকে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে তার জন্য ভারত কি কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে? আইয়ুব খানের শাসনামলের প্রথমদিকে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সিন্ধু অববাহিকা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল সেই চুক্তিতে পাকিস্তানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। আইয়ুব খান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘By may 1959 The main issues had crystallized and the world Bank had reached the stage when they could make us a definite offer Agreement was reached on the general principles on which a water treaty should be based. The word Bank conceded our demand for the construction of a system of replacement works. This was to be a part of the settlement arrangements, with India making a financial contribution.’ তাহলে বাংলাদেশ তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ কেন দাবি করতে পারবে না। ভারতকে অবন্ধুসুলভ আচরণের জন্য একটি দাম তো দিতে হবে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ








