দেশের পানি নিরাপত্তা ও কৃষির উন্নয়নে যে কোনো মূল্যে বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। এছাড়া ‘জুলাই সনদ’ সামনে রেখে সংবিধান সংশোধনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার যে কোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নদী, খাল ও সেচ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় পানি। সংসদ-সদস্যরা নিয়মিত পদ্মা ও তিস্তা নদী নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। আমরা এসব সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি।

সারা বছর কৃষির জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে। যেন পুরো শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের অন্যান্য সময় কৃষি ও প্রয়োজনীয় খাতে সেই পানি সরবরাহ করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা নির্ধারণ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন নম্বর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়াসহ বিভিন্ন খাতে কর কমাতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সীমা যথাক্রমে ৪ লাখ, সাড়ে ৪ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখেন প্রধানমন্ত্রী।

বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংসদের ভেতরে সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যেমন ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা কাজ করতে পারি, তেমনি সংসদের বাইরেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনমত গঠনসহ সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে দেশকে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের সেই ধরনের দায়িত্বশীল আচরণই হবে এ দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা।

সংসদ নেতা বলেন, অতীতে ভালো-মন্দ কী হয়েছে আমি সে বিতর্কে আর যাব না। আমাদের অবশ্যই সামনে চলতে হবে। তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে একটি চিত্র আমরা বারবার দেখেছি। সেটি হচ্ছে আমরা যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে যাই তখন অনেক বেশি অতীত নিয়ে কথা বলি। অথচ দেশের প্রত্যেকটি মানুষ চায়, আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলতে চাই, এই সরকার, এই সংসদ জনগণের। আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করি। জনগণের কষ্ট আমরা অবশ্যই বুঝি। জনগণের সম্পদ রক্ষাকে আমরা পবিত্র দায়িত্ব মনে করি। আমরা এমন একটি বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই, এমন একটি বাংলাদেশকে পেতে চাই যেখানে উন্নয়ন হবে ন্যায্যতাভিত্তিক। অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।

একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে সরকারের যাত্রা শুরু করার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার, ভুল নীতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক খাত বলা যায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। বড় বড় কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যেগুলো এখন জাতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এই সংকট আছে। আমরা সংকটকে অস্বীকার করতে চাই না। তবে আমরা সংকটকে অজুহাতও বানাতে চাই না। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমে সফলভাবে সংকট মোকাবিলা করব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তিন ধাপে অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করতে চায়। পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্বাসন। প্রথম ধাপে অর্থনীতির অবনতি রোধ, মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় ধাপে সরকার চায় রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করা। তৃতীয় ধাপে উৎপাদনশীল উদ্ভাবন নির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিতকে সুদৃঢ় করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই যেখানে তরুণরা চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে না; বরং তার মেধা ও দক্ষতা দিয়ে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। এ কারণে দেশীয় শিল্প বিকাশের জন্য প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সরকার ১৩টি দেশের সঙ্গে ২৩ ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্টেন্ট রিকোয়েস্ট’ করা হয়েছে। সম্পদ ফেরাতে ৬০টির বেশি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়েছে। তিনি বলেন, দেশ ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের মধ্যে থেকে যত দ্রুত এবং যত বেশি সম্ভব সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সব রকমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণ, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।