হ্যারি ট্রুম্যান যখন হোয়াইট হাউস ছেড়েছিলেন, তখন সেনাবাহিনী থেকে পাওয়া মাসে মাত্র ১১৩ ডলার (৮৫ পাউন্ড) পেনশন ছাড়া তাঁর কোনো আয় ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম এই প্রেসিডেন্ট পরে লিখেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা ও সম্মানকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা ঠিক নয়।’
জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগেই তাঁর সব বিনিয়োগ একটি ‘ব্লাইন্ড ট্রাস্ট’-এর (এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে সম্পত্তির মালিক নিজে নিজের তহবিল পরিচালনা করেন না) অধীন হস্তান্তর করেছিলেন। কার্যালয়ে নিজের শেষ সপ্তাহে বুশ বলেছিলেন, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা তাঁর নিজের সম্পদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিল, সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না।
২০২৫ সালে ট্রাম্পের এ বিপুল পরিমাণ আয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, ক্ষমতায় ফেরার কারণে তিনি কতটা লাভবান হয়েছেন। বিভিন্ন লাভজনক ব্যবসার মাধ্যমে তিনি এ অর্থ আয় করেছেন। এর ফলে অনেক সময়ই প্রেসিডেন্টের সরকারি নীতি নির্ধারণের সঙ্গে তাঁর নিজের, পরিবারের ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার সীমানা বা পার্থক্য মুছে গেছে।
কিন্তু এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে। নতুন একটি আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রথম বছরেই ট্রাম্প অন্তত ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার (১ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ড) আয় করেছেন। ইতিহাসবিদেরা বলছেন, এ পরিমাণ আয় কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি হোয়াইট হাউসে থাকার সময় আর্থিক স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলার যে দীর্ঘদিনের নীতি মার্কিন প্রেসিডেন্টরা মেনে চলতেন, তা–ও পুরোপুরি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলার সেন্টারের ইতিহাসবিদ বারবারা পেরি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর কোনো নজির নেই। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে আমরা অতীতে যা দেখেছি, এটি তার সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে।’
২০২৫ সালে ট্রাম্পের এ বিপুল পরিমাণ আয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, ক্ষমতায় ফেরার কারণে তিনি কতটা লাভবান হয়েছেন। বিভিন্ন লাভজনক ব্যবসার মাধ্যমে তিনি এ অর্থ আয় করেছেন। এর ফলে অনেক সময়ই প্রেসিডেন্টের সরকারি নীতি নির্ধারণের সঙ্গে তাঁর নিজের, পরিবারের ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার সীমানা বা পার্থক্য মুছে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর কোনো নজির নেই। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে আমরা অতীতে যা দেখেছি, এটি তার সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে।গত মঙ্গলবার প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক ওই আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি (ডিজিটাল মুদ্রা) খাত থেকেই ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন (১৪০ কোটি) ডলার আয় করেছেন। গত বছর এ বিপুল অর্থ আয় করেন তিনি।
ট্রাম্পের নিজস্ব কিছু নীতিমালার কারণে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার লাভবান হচ্ছে। ফলে তাঁর আয়ের বড় অংশই এখন আসছে এমন সব ডিজিটাল সম্পদ থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতিবিষয়ক কার্যালয়ে (ওজিই) জমা দেওয়া ২০২৫ সালের বার্ষিক ওই আর্থিক বিবরণী থেকে জানা যায়, ট্রাম্প ও তাঁর ছেলেদের যৌথভাবে প্রতিষ্ঠিত ক্রিপ্টো ব্যবসা ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল থেকে ট্রাম্পের কোম্পানিগুলো প্রায় ৮০ কোটি ডলার পেয়েছে। এর মধ্যে ক্রিপ্টো টোকেন বিক্রি থেকে এসেছে ৫২ কোটি ডলারের বেশি ও ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের শেয়ার বিক্রি থেকে ২৫ কোটি ডলারের বেশি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর তাঁর নিজস্ব ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘ট্রাম্প মেমে কয়েন’ বিক্রি করে আরও ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। মাত্র এক বছর আগের আর্থিক বিবরণীতে ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড লিবার্টির টোকেন বিক্রি থেকে ৫ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয়ের কথা জানিয়েছিলেন। চলতি বছরের বিবরণীতে দেখা যাচ্ছে, সেই আয় একধাক্কায় প্রায় ৯ গুণ বেড়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে তাঁর পরিবার ক্রিপ্টোসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অন্তত ২৩০ কোটি ডলার আয় করেছে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প এমন কিছু সরকারি নীতি ও উদ্যোগ নিতে শুরু করেন, যা ক্রিপ্টো খাতের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক বলে বিবেচনা করা হচ্ছিল।
২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণীতে ট্রাম্প বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আইনি রফাদফা বাবদ আরও ৮ কোটি ডলারের বেশি আয় দেখিয়েছেন। এ ছাড়া নিজের কোম্পানির নাম বিদেশি আবাসন ব্যবসায়ীদের ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করেছেন।
এদিকে এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট কিংবা তাঁর পরিবার কখনোই স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াননি এবং ভবিষ্যতেও জড়াবেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ক্রিপ্টো খাতের রাজধানীতে পরিণত করেছেন।’
বারবারা পেরি, ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলার সেন্টারের ইতিহাসবিদক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প এমন কিছু সরকারি নীতি ও উদ্যোগ নিতে শুরু করেন, যা ক্রিপ্টো খাতের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক বলে বিবেচনা করা হচ্ছিল।কেলি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের সব পদক্ষেপই মার্কিন জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছে। তথাকথিত যেসব সাংবাদিক এর উল্টোটা বলছেন, তাঁরা মূলত ডেমোক্র্যাট ও মূলধারার গণমাধ্যমের এক দশকের পুরোনো সেই চর্বিতচর্বণ ও মিথ্যাচারই নতুন করে প্রচার করছেন।’
হোয়াইট হাউস থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের পারিবারিক ব্যবসা এখন তাঁর সন্তানেরা দেখভাল করছেন। তবে এর মূল সুবিধাভোগী তিনি নিজে। ফলে ব্যবসার সব আয় চূড়ান্তভাবে তাঁর পকেটেই যাচ্ছে।
বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ক্রিপ্টোকারেন্সি হলেও তাঁর গলফ কোর্স ও রিসোর্টগুলো থেকে এখনো কোটি কোটি ডলার আয় হচ্ছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের গলফ ও রিসোর্ট খাত থেকে আয় ১৫ শতাংশ বেড়ে ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ট্রাম্প যেসব ক্লাবে বেশি সময় কাটিয়েছেন, সেগুলোয় আয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে ২০২৪ সালে ৫ কোটি ডলার আয় হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি নিকটবর্তী ওয়েস্ট পাম বিচ গলফ ক্লাবের আয় বেড়েছে ২৭ শতাংশ। তবে লস অ্যাঞ্জেলেসে ট্রাম্পের গলফ কোর্সের আয় কমেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পদের পরিমাণ আসলে কত, সত্যিই কি তিনি ধনকুবেরআর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, গত বছর চার্লস শোয়াব ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছেন ট্রাম্প। তবে এ ঋণ কী উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে, তা বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্পের আবাসন ব্যবসা থেকে আয় বৃদ্ধির গতি ছিল তুলনামূলক শ্লথ। ডজনখানেক বড় বাণিজ্যিক আবাসন প্রকল্প, বিশেষ করে কয়েক দশক আগে তাঁর নির্মিত বা কেনা ভবনগুলো থেকে আয়ের কথা জানিয়েছেন তিনি।
বিবরণীতে নিউইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারের মতো সম্পত্তিগুলোর সুনির্দিষ্ট ভাড়ার অঙ্ক উল্লেখ না করে আয়ের একটি সীমা দেখানো হয়েছে। অধিকাংশ সম্পত্তির ক্ষেত্রেই ২০২৫ সালের আয়ের এ সীমা এক দশক আগের তুলনায় একই রকম বা কম ছিল।








