দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্ক বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলগত জোট হিসাবে দেখা হলেও, সাম্প্রতিক নানা ঘটনা সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ, ইরানকে ঘিরে ভিন্ন অবস্থান এবং লেবানন যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য দুদেশের সম্পর্ক অস্বস্তিকর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এরই মধ্যে ইসরাইল নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের এক বক্তব্যের জেরে দেশ দুটির মধ্যে টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্বের এই আবহেই ভারতের সমর্থনের কথা তুলে ধরে নতুন কূটনৈতিক বার্তা দিলেন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বে ইসরাইলের আরও অনেক বন্ধু রয়েছে এবং ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কাছ থেকে ‘অভাবনীয়’ সমর্থন পাচ্ছেন তারা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। আল-জাজিরা, এনডিটিভি।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলের অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করছে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা ইসরাইলের নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ক আগের মতো নিঃশর্ত থাকবে কি না-তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গাজা, ইরান ও লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের কারণে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা নেতানিয়াহু ভারতের অবস্থান বড় ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আরও কিছু বন্ধু রয়েছে, যেমন : ভারত নামের ছোট একটি দেশ। সেখানে ১৪০ কোটি মানুষের বসবাস এবং দেশটির সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমরা অবিশ্বাস্য রকমের সমর্থন পাচ্ছি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভারতীয়দের কাছ থেকে ইসরাইলের পক্ষে বিপুল সমর্থনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজের ইতিহাসে ইসরাইলের ‘সবচেয়ে বড় বন্ধু’ হিসাবে আখ্যা দেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের প্রতিও নিজের শ্রদ্ধাবোধ ব্যক্ত করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শ্রদ্ধাবোধ থাকার মানে এই নয় যে ভ্যান্সের সব কথার সঙ্গে আমাকে একমত হতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরাইল-বিরোধী বা ইহুদি-বিরোধী প্রচারণা এখন ফ্যাশনে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু পর্দার পেছনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক দেশের শীর্ষ নেতারা ব্যক্তিগতভাবে তাকে ফোন করেন এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই করার পাশাপাশি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর রণকৌশল শিখিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। কয়েক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউজে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স ইসরাইলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইসরাইলের উচিত হবে না বিশ্বের বুকে তাদের অবশিষ্ট থাকা একমাত্র শক্তিশালী মিত্রের (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে বৈরিতা করা।
গত মাসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সই করা একটি সমঝোতা স্মারককে সমর্থন করতে গিয়ে ভ্যান্স এই মন্তব্য করেছিলেন। মার্কিন-ইরান সমঝোতার সেই শর্তানুযায়ী লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও ইসরাইল তা এখনো মেনে নেয়নি। এই প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু দাবি করেন, দক্ষিণ লেবাননের বেশকিছু খ্রিষ্টান অধ্যুষিত গ্রাম নাকি হিজবুল্লাহর হাত থেকে বাঁচতে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে, যার কারণে তারা সেখানে অবস্থান করছেন। তবে লেবানন পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে জেডি ভ্যান্সের একচ্ছত্র মার্কিন আধিপত্যের দাবিকে ভারতের নাম টেনে সরাসরি নাকচ করে দিলেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী।








