অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ‘ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন’ রেলপথ প্রকল্প। বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক এই মেগা প্রকল্পের ৯০ কিলোমিটার রেলপথের প্রায় ৬০ কিলোমিটারই হবে উড়াল (এলিভেটেড)। এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও চূড়ান্ত নকশার কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে মাত্র ৩ ঘণ্টা; বর্তমানে যেখানে ৭ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহণেও আসবে যুগান্তকারী পরিবর্তন। অর্থায়ন নিশ্চিত করে আগামী বছরের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরুর আশা করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, রেলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে কাজ চলছে। কর্ড লাইন চালু হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা লাগবে। যাত্রী সেবার পাশাপাশি পণ্য পরিবহণেও এটি হবে রেলের সবচেয়ে লাভজনক রুট। তিনি বলেন, কর্ড লাইনের পাশাপাশি নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংগ্রহের কাজও চলছে। এর মধ্যে ২৬০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ, ৩০টি লোকোমোটিভ, ২০০টি এমজি ক্যারেজ, ৪টি হুইল লেদ ও ৪টি রিলিফ ট্রেন সংগ্রহের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রায় শেষ।
জানা যায়, বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। রেলপথ ঘুরে যাওয়ায় এর দূরত্ব ৩২০ কিলোমিটার। আন্তঃনগর ট্রেনে এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ৭ থেকে সাড়ে ৭ ঘণ্টা; লোকাল বা মেইলে তা ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগে। অথচ কর্ড লাইন হলে দূরত্ব ও সময়-দুটোই অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে পণ্য পরিবহণে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী ট্রেন আসতে ১৭-১৮ ঘণ্টা লাগে। কর্ড লাইন হলে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টায় পণ্যবাহী ট্রেন যাতায়াত করতে পারবে। এছাড়া বর্তমানে এ রুটে মাত্র ২-৩ শতাংশ পণ্য রেলপথে পরিবাহিত হয়, কর্ড লাইন হলে তা ২০-৩০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। নির্মাণাধীন বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি চালু হলে পণ্য পরিবহণের যে বিশাল চাপ তৈরি হবে, তা সামলাতে এই কর্ড লাইন আশীর্বাদ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা প্রায় ৩০ বছর ধরেই এই কর্ড লাইন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০১১ সালে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠনের পরও বেশ কয়েকবার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দুটি প্রকল্পে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও ট্রেনের কাঙ্ক্ষিত গতি বাড়েনি; বরং গত দুই যুগে এ রুটে ট্রেনের গড় গতি ৬৬ কিলোমিটার থেকে কমে ৫৭ কিলোমিটারে নেমেছে। তবে বর্তমান সরকার এই স্থবিরতা কাটিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। দ্রুত কাজ শুরু করতে প্রস্তাবিত বাজেটেও এর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) প্রকৌশলী আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, কর্ড লাইনটি ঢাকা থেকে ফতুল্লা-শ্যামপুর ও নরায়ণগঞ্জ পার হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর দিয়ে সরাসরি চলে যাবে কুমিল্লা পর্যন্ত। (বর্তমান রুট-ঢাকা থেকে টঙ্গী, ভৈরব ও আখাউড়া হয়ে কুমিল্লা)। প্রকল্পে ৯০ কিলোমিটার রুটের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ হবে উড়াল। উড়াল অংশ ঢাকা থেকে শুরু হয়ে দাউদকান্দির গোমতি পর্যন্ত যাবে। পুরো রুটে কোনো লেভেল ক্রসিং থাকবে না। প্রয়োজনীয় সব জায়গায় আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ করা হবে, যাতে ট্রেন তার সর্বোচ্চ গতিতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে।
এই প্রকৌশলী আরও বলেন, পুরো রেলপথটি ব্রডগেজ করা হবে, এতে এ রুটে মিটার ও ব্রজগেজ উভয় ট্রেন চালানো যাবে। প্রকল্পের বিস্তারিত সমীক্ষা ও চূড়ান্ত নকশার কাজ একদম শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পটি নির্মাণে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ছাড়াও দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থাই পিপিপি মডেলে অর্থায়নে আগ্রহী। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মধ্যেই কাজ শুরু করা যাবে। প্রকল্প শেষে এই রুটে প্রতিদিন শতাধিক ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।








