‘টাকা ছাড়া ঠান্ডা পানি... টাকা ছাড়া কলের ঠান্ডা পানি... পানি খাওয়ার লোক নাই আর?...’
পানি ভর্তি বালতি হাতে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের জানালায় হাঁকডাক দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। প্রথম দেখায় যে কেউ ভাববেন হকার, কিন্তু না। তিনি আসলে এক হতভাগ্য বাবা। যিনি দুরারোগ্য ব্লাড ক্যানসারে ছেলেকে হারিয়ে ৬ বছর ধরে এভাবে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের তৃষ্ণা মিটিয়ে খুঁজে ফেরেন হারানো সন্তানকে।
রাজবাড়ীর কালুখালীর মুন্নু শেখ। পেশায় তিনি একজন চটপটি বিক্রেতা হলেও দুপুরে রাজশাহীগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই তিনি পানি নিয়ে হাজির হন প্ল্যাটফর্মে। এবং ট্রেন থামা মাত্রই তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন ঠান্ডা পানির বোতল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে মুন্নু শেখের ৯ বছর বয়সি ছেলে সবুজ শেখের ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। ছেলেকে নিয়ে নিয়মিত এই ট্রেনে করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাতায়াত করতেন তিনি। অনেক সময় ফেরার পথে অসুস্থ ছেলেকে এক বোতল পানি কিনে দেওয়ার মতো টাকাও থাকত না তাঁর কাছে। দীর্ঘ লড়াই শেষে ক্যানসারের কাছে হার মেনে ২০২০ সালে না-ফেরার দেশে চলে যায় সবুজ। সন্তানের মৃত্যু মুন্নু শেখকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি তখন প্রতিজ্ঞা করেন, যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন ট্রেনে কোনো তৃষ্ণার্ত যাত্রীকে পানির কষ্ট পেতে দেবেন না।
সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই প্রতিদিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই নিজের চটপটির দোকান বন্ধ করে পানি সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। এরপর ঠান্ডা পানির বোতল হাতে ছুটে যান ট্রেনের প্রতিটি বগির সামনে। তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন একে একে পানির বোতল।
মুন্নু শেখের ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় মুগ্ধ ট্রেনের যাত্রীসহ সাধারণ জনগণ।

ট্রেনযাত্রী আয়ুব মিয়া বলেন, ‘কাজের খোঁজে ফরিদপুরে গিয়েছিলাম। দুই দিন কাজ করার পর অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। গরমে পানির পিপাসা লাগলেও ট্রেনে খাবার পানি না থাকায় খেতে পারিনি। কিন্তু কালুখালীতে এসে দেখি জানালা দিয়ে এক ব্যক্তি “টাকা ছাড়া পানি, পানি” বলে ডাকছে। সেই পানি খেয়ে তৃষ্ণা মিটালাম। এখনো যে ভালো মানুষ আছে, তার প্রমাণ এই পানিওয়ালা।’
আরেক যাত্রী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘যাত্রাপথে পানি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কালুখালীতে বিনা মূল্যে ট্রেনে থাকা যাত্রীদের পানি খাওয়ানোর বিষয়টা একদম ব্যতিক্রমী। বিষয়টি চমৎকার লেগেছে।’
মুন্নু শেখ বলেন, ‘যখন ছোট কোনো শিশুর হাতে পানি তুলে দিই, তখন আমার ছেলে সবুজের মুখটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, যেন ওকেই পানি খাওয়াচ্ছি। যতদিন বাঁচব, এভাবে পানি খাইয়ে যাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘চটপটি বিক্রির পাশাপাশি যাত্রীদের পানি খাওয়ানোর জন্য বোতল সংগ্রহ করি। ট্রেন আসার আগে বোতলগুলো ভালোভাবে ধুয়ে টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি ভর্তি করে রাখি। ট্রেন আসা মাত্রই ছুটে যাই যাত্রীদের কাছে। এ সময় অনেকে বোতল ফেরত দেন, আবার অনেকে নিয়ে যান। এভাবে ছয় বছর ধরে পানি খাওয়াচ্ছি। পানি খাওয়াতে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা দোকান বন্ধ রাখতে হয়। এতে আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতি হলেও কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ মানুষের মুখে হাসি আর অন্তরের শান্তিই তার কাছে এখন সবচেয়ে বড় সম্পদ।’
রুবেলুর রহমান/এফএ/জেআইএম








