হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘শাপলা’ নামক একটি গোপন কোডের গরমিল হওয়াকে কেন্দ্র করে টুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়াগামী ৭৬ যাত্রীর মানব পাচার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার ঘটনাটি যেমন স্বস্তিদায়ক, তেমনই উদ্বেগজনকও বটে। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের চিত্র নয়, বরং দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা এক ভয়াবহ দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ। উদ্বেগের বিষয়টি হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনা সামনে এলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে।

কীভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও অসংগতিপূর্ণ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক যাত্রী চেক-ইন কাউন্টার এবং ইমিগ্রেশনের মতো একাধিক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা স্তর নির্বিঘ্নে পার হয়ে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন-এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আইন প্রয়োগকারী ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এমনটি ঘটা যে অসম্ভব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অতীতেও সিভিল এভিয়েশনের অ্যারোড্রাম অপারেটরের মতো দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিদের এই চক্রের মূল হোতা হিসাবে আটকের নজির রয়েছে। সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনেও পুলিশসহ একাধিক স্তরের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার যে অভিযোগ এসেছে তা প্রমাণ করে, বিমানবন্দরের ভেতরের একটি বড় অংশ এই অপরাধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মূলত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী নিয়োগের পথ সংকুচিত বা বন্ধ থাকায় এই সুযোগটি নিচ্ছে অপরাধচক্র। শুধু মালয়েশিয়া নয়, ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব পাঠিয়ে সেখান থেকে কাতার, মিসর হয়ে নৌপথে ইতালিতেও মানব পাচার করছিল এ চক্র। সন্দেহ নেই, এটি বন্ধ না হলে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ধূলিসাৎ হবে এবং বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর আস্থা হারানোর যে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা করছেন, তা-ই সত্যে পরিণত হবে। বিমানবন্দরকে মানব পাচারের নিরাপদ রুট হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে ইমিগ্রেশন ও সিভিল এভিয়েশনের ভেতরের এই ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন জিরো টলারেন্স নীতি। একই সঙ্গে পুরো বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার ডিজিটাল আধুনিকায়ন এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি না হলে রাষ্ট্রীয় প্রবেশদ্বারের এই ক্ষয় রোধ করা অসম্ভব।