বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রতারণা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করলেও এই খাতে কার্যকর কোনো নজরদারি নেই। সম্প্রতি ‘জাস্ট থট এডুকেশন কনসালট্যান্ট’-এর বিরুদ্ধে মানববন্ধন এবং বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের মালিকের ৩৩ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোকের ঘটনা এই খাতের গভীর অনিয়মের দিক উন্মোচিত হয়েছে।শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পণ্য করে ব্যবসা-এমনই এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে দেশের শিক্ষাকনসালট্যান্সি খাতে। ‘জাস্ট থট এডুকেশন কনসালট্যান্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাউকে বিদেশে না পাঠিয়ে অফিস বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে গেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর একটি সড়কে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা হারানো অর্থ ফেরত এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ঝুমা হক বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার আশায় পরিবারের শেষ সম্বল জমি বন্ধক রেখে ও গয়না বিক্রি করে ২০ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। এখন টাকাও গেছে, পড়ার স্বপ্নও শেষ। আমরা পথে বসে গেছি।’ তিনি অভিযোগ করেন, থানায় মামলা করা হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি।শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি তুলে ধরেছেন। এগুলো হচ্ছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা, অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং স্টুডেন্ট ভিসা এজেন্সিগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি বাড়ানো।পুলিশ জানায়, জাস্ট থট, গো ভিসা, গ্লোবাল ভিসা, ভিসা গাইড ও গ্লোবাল নামে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এরই মধ্যে চক্রের এক সদস্য মতিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মূল অভিযুক্তরা এখনও পলাতক।ভাটারা থানার অফিসার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম জানান, মামলার তদন্ত চলছে এবং প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের মালিক খায়রুল বাশার বাহারের প্রায় ৩৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি বড় স্ত্রীর নামে ভাটারায় একটি ফ্ল্যাট, দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে শেলটেক বীথিকা প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাট, নিজের নামে রাজাবাজারে দুটি ফ্ল্যাট ও আজিজ সড়কে জি+৭তলা ও জি+৬তলা দুটি ভবনসহ নিজের ও প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ হাজার ৪৮২ দশমিক ৫ শতাংশ জমি কিনেছেন।সিআইডি জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি মৌজায় তার নামে ও প্রতিষ্ঠানের নামে এক হাজার ১০৬ শতাংশ জমির তথ্য মিলেছে, যার দলিল মূল্য ১০২ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি। তবে এর বাজার মূল্য অন্তত ৬০০ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করা এসব প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও বিশ্বখ্যাত আইডিপির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক পর্যায়ের ছোট ছোট অফিস রয়েছে সারা দেশে।  বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক, জাস্ট থট এডুকেশন কনসালট্যান্ট ছাড়াও আরও কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হিসেবে ‘মেসেস বিডি’ কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও মালয়েশিয়ার ২০০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করে। পিএফইসি গ্লোবাল অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ায় ২২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে ভর্তি করিয়েছে। লুমস গ্লোবাল অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপ ও মালয়েশিয়ায় ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে সহায়তা করেছে। এডুকেশন হাব লিমিটেড নিজেদের ‘সবচেয়ে বিশ্বস্ত’ কনসালট্যান্ট দাবি করে।এছাড়াও, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার মতো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব অনুমোদিত এজেন্ট তালিকা রয়েছে। ম্যাসি ইউনিভার্সিটি বা নরউইচ ইউনিভার্সিটি অফ দ্য আর্টস-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এসব তালিকা দেখা যায়।বাংলাদেশে এজেন্সি ব্যবসা অত্যন্ত সহজলভ্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। একটি অফিস, কিছু ওয়েবসাইট আর বিজ্ঞাপন দিলেই ‘বিদেশে পড়ানোর কনসালট্যান্ট’ হওয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকি করার জন্য সরকারের কাছে কোনো কার্যকর সংস্থা নেই। যা প্রতারণার সুযোগ তৈরি করে। অভিযোগ উঠছে, অনেক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কমিশনের বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ থাকে, যার ফলে তারা শিক্ষার্থীকে তার জন্য সেরা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই পাঠানোর চেষ্টা করে।এই প্রতারণা রোধে ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতারিত শিক্ষার্থীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা রোধে সরকারি নজরদারি বাড়ানোর জোর দাবি জানানো হয়েছে।শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির আগে তার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা, ‘স্বল্প খরচে দ্রুত ভিসা’ জাতীয় বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হওয়া এবং স্কলারশিপ ও ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিজে তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ঘিরে এসব প্রতারণার ঘটনা শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছে। নষ্ট করছে তাদের সময় ও অর্থ। এই খাতে নিয়ন্ত্রণ আনা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বহু শিক্ষার্থী এই প্রতারণার শিকার হবেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।