দেশের আম গবেষণার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রটি ১৯৯০ সালে বর্তমান নামে কার্যক্রম শুরু করে। সময়ের সঙ্গে গবেষণার পরিধি বাড়লেও দীর্ঘ ৩৬ বছরে কেন্দ্রটি মাত্র ১৬টি নতুন আমের জাত উদ্ভাবন করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রম ও অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গবেষণা কেন্দ্রটি ঘুরে দেখা যায়, পুরোনো ও সীমিত সরঞ্জাম নিয়েই চলছে গবেষণা কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখনো স্থায়ী প্রধান কর্মকর্তার পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে কেন্দ্রটি। জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে গবেষণার গতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষকদের অভিযোগ, ফসলের রোগবালাই বা অন্যান্য সমস্যার নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কেন্দ্রটিকে অনেক সময় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে রোগ শনাক্তকরণ ও সমাধান পেতে বিলম্ব হয়, আর সেই অপেক্ষার খেসারত দিতে হয় চাষিদের।

‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের আমের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে বারি-৪। স্বাদ, গুণগত মান ও বাজার চাহিদার কারণে এই জাতটি ইতোমধ্যে চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে বারি উদ্ভাবিত অন্যান্য জাতের আমের চাহিদা বাজারে তুলনামূলকভাবে কম।’

কেন্দ্রটিতে বিজ্ঞানীর অনুমোদিত পদ রয়েছে ১০টি। তবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। ফলে গবেষণার অনেক ক্ষেত্রই অগ্রাধিকার অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে ৩৬ বছরে ১৬ জাতের আম উদ্ভাবনবারি উদ্ভাবিত আমের বিভিন্ন জাতের চারা/ ছবি: জাগো নিউজ

সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক গবেষণা সরঞ্জাম ও কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না।

তাদের দাবি, আম উৎপাদনে দেশের শীর্ষ অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত এ কেন্দ্রকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা হলে নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন প্রযুক্তি উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

আমের চেয়ে বেশি খরচ ক্যারেট-পরিবহনে, বিপাকে চাষিরা

তবে যে ১৬টি জাত এখন পর্যন্ত উদ্ভাবন হয়েছে। সে আমগুলোর বাজারে চাহিদা অনেক। এর মধ্যে বারি আম-৪, বারি আম-১১, বারি আম-১২, বারি আম-১৩সহ বেশ কয়েকটি জাত ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাষিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্বাদ, রং, আকার, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অধিক ফলনশীলতার কারণে এসব জাতের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।

‘এ কেন্দ্রের কার্যক্রম শুধু আম গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমের পাশাপাশি ডালিম, বরই, আতা ও অন্যান্য ফল ফসলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ চলছে। এছাড়া ফল, ফুল ও সবজি নিয়ে গবেষণারও সুযোগ রয়েছে। তবে গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য যে পরিমাণ জমি ও অবকাঠামো প্রয়োজন, তা বর্তমানে নেই। তারপরও ধীরে ধীরে কেন্দ্রটির কার্যক্রমের পরিধি বাড়ছে এবং নতুন ভবন নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে।’

বিশেষ করে গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবিত অধিকাংশ জাতই নাবি বা লেট ভ্যারাইটির হওয়ায় মৌসুমের শেষ ভাগেও বাজারে আম সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। যখন অন্যান্য জাতের আমের মৌসুম শেষ হয়ে যায়, তখন এসব আম বাজারে আসায় ভালো দাম পাওয়া যায়। ফলে চাষিরা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, তেমনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভোক্তারাও দীর্ঘ সময় ধরে আমের স্বাদ উপভোগ করতে পারছেন।

তবে আম চাষিরা বলছেন, বারি-৪ ছাড়া অন্য জাতগুলো গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবিত নয়। অন্য দেশের আমের চারা এনে নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছেন।

স্থানীয় আমচাষিদের ভাষ্য, দেশের আম উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে প্রত্যাশাও অনেক বেশি।

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে ৩৬ বছরে ১৬ জাতের আম উদ্ভাবন

তাদের মতে, গবেষণা কেন্দ্রটি শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশের আমশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, সংকট মোকাবিলা এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করে পূর্ণাঙ্গ ‘আম গবেষণা ইনস্টিটিউট’ হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন

কৃষিমন্ত্রী / কাঁঠাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে শিঙাড়া-সমুসা-কাবাব, পুষ্টিগুণও অনেক বেশি

চাষিদের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক গবেষণা সরঞ্জাম ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আম গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং দেশের আমশিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে।

‘‌দেশের আম উৎপাদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও সেই অনুপাতে গবেষণা কার্যক্রমের উন্নয়ন ঘটেনি। আমচাষিদের নানা সমস্যা, নতুন জাতের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণা কেন্দ্রটির ভূমিকা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন ছিল।’

শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, দেশের আম উৎপাদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও সেই অনুপাতে গবেষণা কার্যক্রমের উন্নয়ন ঘটেনি। আমচাষিদের নানা সমস্যা, নতুন জাতের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণা কেন্দ্রটির ভূমিকা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, গত ৩৬ বছরে গবেষণা কেন্দ্র থেকে ১৬টি আমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। কিন্তু এসব জাতের মধ্যে বারি আম-৪ ছাড়া অন্য কোনো জাত মাঠপর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি। কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাত উদ্ভাবনে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল। উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা নয়, বরং সেগুলোর মাঠপর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা ও বাণিজ্যিক সফলতাই গবেষণার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইসমাইল খান শামীম আরও বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জকে কেন্দ্র করেই দেশের বৃহৎ আম অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। অথচ এখনো এখানে পূর্ণাঙ্গ কোনো আম গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিদ্যমান গবেষণা কেন্দ্রকে আধুনিকায়ন করে এর কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি জনবল সংকট দূর করা জরুরি। পর্যাপ্ত বিজ্ঞানী, আধুনিক গবেষণা যন্ত্রপাতি এবং উন্নত পরীক্ষাগার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আমের নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, দেশের আমশিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ অঞ্চলের লাখো আমচাষির স্বার্থে গবেষণা কেন্দ্রটিকে শক্তিশালী ও যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এখনই উপযুক্ত সময়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের আমের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে বারি-৪। স্বাদ, গুণগত মান ও বাজার চাহিদার কারণে এই জাতটি ইতোমধ্যে চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে বারি উদ্ভাবিত অন্যান্য জাতের আমের চাহিদা বাজারে তুলনামূলকভাবে কম।

তিনি বলেন, বারি-৪ আমটি অনেকটা কাঁচামিঠা জাতের আমের মতো। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কাঁচা অবস্থায়ও খেতে বেশ সুস্বাদু এবং পাকলে অত্যন্ত মিষ্টি ও রসালো হয়ে ওঠে। ফলে ভোক্তারা দুই অবস্থাতেই আমটি পছন্দ করেন। স্বাদ ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্যতার কারণে বাজারে এর আলাদা কদর তৈরি হয়েছে।

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে ৩৬ বছরে ১৬ জাতের আম উদ্ভাবন

মো. আব্দুল হালিম আরও বলেন, শুধু স্বাদের দিক থেকেই নয়, বাণিজ্যিকভাবেও বারি-৪ একটি সফল জাত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। উৎপাদন ভালো হওয়া, বাজারমূল্য তুলনামূলক বেশি পাওয়া এবং ভোক্তাদের আগ্রহ থাকায় দিন দিন এই আমের চাষ বাড়ছে। ভবিষ্যতে রপ্তানির ক্ষেত্রেও বারি-৪ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আরও পড়ুন

লিচুর বাগানে বদলে গেছে পিরোজপুরের অর্থনীতি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, এ কেন্দ্রের কার্যক্রম শুধু আম গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমের পাশাপাশি ডালিম, বরই, আতা ও অন্যান্য ফল ফসলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ চলছে। এছাড়া ফল, ফুল ও সবজি নিয়ে গবেষণারও সুযোগ রয়েছে। তবে গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য যে পরিমাণ জমি ও অবকাঠামো প্রয়োজন, তা বর্তমানে নেই। তারপরও ধীরে ধীরে কেন্দ্রটির কার্যক্রমের পরিধি বাড়ছে এবং নতুন ভবন নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃত করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবতায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে আমকেন্দ্রিক গবেষণার কারণে অধিকাংশ জমি আমবাগান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে অন্যান্য ফল, ফুল ও সবজি নিয়ে ব্যাপক পরিসরে গবেষণা পরিচালনার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে আম সংরক্ষণ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আধুনিক পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রতিষ্ঠার তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ কেন্দ্রে এখনো কোনো স্বতন্ত্র সংরক্ষণ গবেষণাগার গড়ে ওঠেনি। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সরবরাহের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানান তিনি।

তার মতে, আধুনিক ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আমের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি, গুণগত মান উন্নয়ন এবং রপ্তানিযোগ্যতা বাড়াতে আরও কার্যকর গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

এনএইচআর/এএসএম