গোবরা গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে একের পর এক গাভির খামার। কোথাও গরুকে খাবার দেওয়া হচ্ছে, কোথাও চলছে দুধ দোহনের ব্যস্ততা। প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠানে হাঁস-মুরগি, গোয়ালে গরু-ছাগল, পাশে মাছের পুকুর আর সবজির আবাদ। পুরো গ্রামটিই যেন একটি ছোট কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি। একসময় নিভৃত এ গ্রাম এখন পরিচিত ‘গাভির গ্রাম’ নামে। আর এ পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু একজন মানুষ—তিনি সিরাজুল ইসলাম। তিনি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার গোবরা গ্রামের বাসিন্দা।

ছোটবেলা থেকেই সিরাজুলের স্বপ্ন ছিল উদ্যোক্তা হওয়া। শুধু নিজের কর্মসংস্থান নয়, এলাকার বেকার মানুষদের জন্যও কিছু করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। এক যুগের নিরলস পরিশ্রম, ধৈর্য ও পরিকল্পনায় তিনি সে স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন। গাভির খামার থেকে এখন তাঁর মাসে আয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা। তাঁর অনুপ্রেরণায় অর্ধশতাধিক মানুষ গাভি ও ছাগলের খামার গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বদলে গেছে গোবরা গ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র।

গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য রেজাউল করিম বলেন, সিরাজুল তাঁদের গর্ব। তাঁর দেখানো পথ ধরে অনেক পরিবার খামার গড়ে ভাগ্য বদলেছে। শুধু তাঁদের গ্রাম নয়, আশপাশের গ্রামেও গাভি পালন ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

নিজের খামারে বসে ছাগলকে আদর করছেন উদ্যোক্তা সিরাজুল। সম্প্রতি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার গোবরা গ্রামে

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের গ্রাম গোবরা এখন যেন এক জীবন্ত খামার। সিরাজুলের বাড়িতে ঢুকতেই সুপারিগাছের সারি আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নজর কাড়ে। বাড়ির পাশেই গাভির খামারে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। প্রতিবেদককে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এসে ঘুরে দেখান গাভি, মাছ, ছাগল ও মুরগির খামার। সেই ফাঁকেই শোনান তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

১৯৮৩ সালে জন্ম নেওয়া সিরাজুল তিন ভাইবোনের মধ্যে বড়। বাবা ফজলুর রহমান ছিলেন ব্যবসায়ী। ২০১৩ সালে লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করার পর কাউনিয়া উপজেলার শাহবাগ গ্রামের একটি খামার পরিদর্শনে যান তিনি। সেখানে সফল খামারি আবদুর রহমানের জীবনসংগ্রামের গল্প তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাঁর কাছ থেকেই গাভি ও ছাগল পালনের নানা কৌশল শেখেন।

একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাবার কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিয়ে বাড়ির পাশে ছোট একটি গাভির খামার গড়ে তোলেন সিরাজুল। শুরুতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গাভির রোগ, খাদ্যের দাম, পরিচর্যা—সবকিছুই ছিল নতুন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। মাত্র ১০ মাসের মধ্যে ৪টি গাভি দুধ দেওয়া শুরু করে। প্রথম বছরেই দুধ ও বাছুর বিক্রি করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা আয় হয়। সেই লাভের টাকাই আবার খামারে বিনিয়োগ করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাভির সংখ্যা, বাড়তে থাকে তাঁর আত্মবিশ্বাসও।

বর্তমানে সিরাজুলের খামারে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২৬টি গাভি রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ লিটার দুধ হয়। দুধ বিক্রির পাশাপাশি বাছুর বিক্রি করেও বছরে উল্লেখযোগ্য আয় করেন তিনি। সব মিলিয়ে গাভির খামার থেকেই মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

গাভির খামারের পাশাপাশি ৩০ শতক জমির পুকুরে মাছ চাষ করছেন সিরাজুল। রয়েছে ২০০টি মুরগি ও ২০টি ছাগলের খামার। এসব থেকেও বছরে অতিরিক্ত প্রায় দুই লাখ টাকা আয় হয়। এ আয়ে তিনি পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন, জমি কিনেছেন, মোটরসাইকেল কিনেছেন, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করেছেন এবং বাড়ির চারপাশে ফলদ গাছ ও সবজির বাগান গড়ে তুলেছেন।

তবে সিরাজুলের সবচেয়ে বড় অর্জন নিজের সাফল্য নয়, অন্যদের সফল করে তোলা। তাঁর পরামর্শে গ্রামের বহু তরুণ খামার গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এইচএসসি পাসের পর চার বছর বেকার ছিলেন জিকরুল হক। ২০২০ সালে তিনি তিনটি বিদেশি জাতের গাভি দিয়ে খামার শুরু করেন। এখন তাঁর দৈনিক আয় প্রায় এক হাজার টাকা। পাকা বাড়ি করেছেন, ৪০ শতক জমিও কিনেছেন।

একরামুল হক, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, পীরগাছালেখাপড়া শেষ করে সবাই চাকরির পেছনে ছোটেন। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে খামার করেও যে নিজের পাশাপাশি অন্যের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তাঁর উজ্জল দৃষ্টান্ত সিরাজুল ইসলাম। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে সব সময় তাঁকে সহযোগিতা করা হয় বলে জানান তিনি।

মোস্তাফিজার রহমানও চার বছর আগে তিনটি গাভি দিয়ে খামার শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ১৪টি গাভি রয়েছে। দুধ বিক্রি করে মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করছেন। তিনি বলেন, ‘সিরাজুল ভাইকে দেখে সাহস পেয়েছিলাম।’ এখন খামারই তাঁর পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।

ভবিষ্যতে ২০০টি গরুর একটি আধুনিক খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন সিরাজুল। পাশাপাশি মাছের পুকুরের ওপর মাচা তৈরি করে হাঁস-মুরগি পালনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। বেকারদের ভাগ্য উন্নয়নের পেছনে কী অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল জানতে চাইলে তিনি শুধু মিষ্টি করে হাসেন। তরুণদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস বা অন্য কোনো চাকরির পরীক্ষার জন্য যে সময় ব্যয় হয়, তা যদি নির্দিষ্ট কোনো কাজে ব্যয় করা যেত, তাহলে চাকরির চেয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব। দেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের তুলনায় চাকরির সুযোগ এক শতাংশের কম। তাই তরুণসমাজকে উদ্যোক্তা হতে হবে। শুধু চাকরির আশায় বসে না থেকে নিজে কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। তবেই ব্যক্তি, সমাজ তথা দেশের উন্নয়ন হবে।

অন্নদা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, চাকরির পেছনে না ছুটে খামার গড়ে সিরাজুল যে সাফল্য এনেছে, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর পথ অনুসরণ করে অনেক বাড়ি এখন খামারে পরিণত হয়েছে। দেশে শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য তাঁর এ কাজ অবশ্যই অনুকরণীয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা একরামুল হক বলেন, লেখাপড়া শেষ করে সবাই চাকরির পেছনে ছোটেন। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে খামার করেও যে নিজের পাশাপাশি অন্যের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তাঁর উজ্জল দৃষ্টান্ত সিরাজুল ইসলাম। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে সব সময় তাঁকে সহযোগিতা করা হয় বলে জানান তিনি।