ঢাকার সাভার উপজেলা প্রশাসনের কনফারেন্স কক্ষে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের খেলা দেখছিলেন সাভারের দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি), কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনরা।
সেসময়ের ভিডিও ফুটেজ ধারণ এবং কনফারেন্স কক্ষে খেলা দেখা নিয়ে প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
মারধরের শিকার ঢাকা টুডে ও মুভি বাংলা টেলিভিশনের সাংবাদিক মো. দিদারুল ইসলাম বর্তমানে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছেন।
দিদারুল ইসলামের ভাষ্য, পেশাগত কারণে মঙ্গলবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনকে ফোন দেন। তার কথামতো ক্যামেরাম্যান মোজাহারকে নিয়ে উপজেলা কার্যালয়ে যান। উপজেলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে তিনি দেখেন, সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন, আমিনবাজারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেন, কয়েকজন কর্মকর্তা–কর্মচারী এবং কয়েকজন বহিরাগত কনফারেন্স কক্ষে বসে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ দেখছেন।
দিদারুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনকে প্রশ্ন করি, সরকারি এসি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাতে খেলা দেখার আয়োজন কি আইনের পরিপন্থি নয়?”
তার অভিযোগ, প্রশ্ন করার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) তার হাত থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে নেন। অন্যরা ক্যামেরাম্যানের কাছ থেকে ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে মেমোরি কার্ড খুলে নেয়। পরে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন তাকে মারধর করেন। দীর্ঘ সময় আটকে রেখে মোবাইল কোর্টে দণ্ড দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে একটি মুচলেকা নেওয়া হয়। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলে তিনি সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হেমায়েতপুর এলাকার আল-আকসা নামের একটি কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির স্টাফ উজ্জ্বল মিয়াকে আটক করে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাকে ২০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, “রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম আমাকে ফোন দেন। পরে তিনি ওই কারখানার লোকজনকে নিয়ে আমার কাছে আসেন। আমি ধারণা করেছিলাম, তারা জরিমানার টাকা নিয়ে আসামিকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছেন। তাই খেলা দেখা বাদ দিয়ে বাইরে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলি।”
সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর দাবি, দিদারুল ইসলাম ওই কারখানার পক্ষে তদবির করে জরিমানা কমানোর অনুরোধ করেন। তবে জরিমানা হয়ে যাওয়ার পর আর কিছু করার সুযোগ নেই বলে তাকে জানানো হয়। এরপর দিদারুল ইসলাম বাইরে থেকে কনফারেন্স কক্ষে খেলা দেখার ভিডিও ধারণ করেন এবং কক্ষে ঢুকে সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে খেলা দেখার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, “আমরা তাকে শান্ত হতে বলি। কিন্তু তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি মদ্যপ অবস্থায় কথা বলছেন। তখন তাকে বলি, আপনি একটি অবৈধ কারখানার পক্ষে তদবির করতে এসেছেন। আপনাকে আটক করা হলো। পরে সাংবাদিকদের অনুরোধে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাকে মারধর করা হয়নি। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই তিনি মারধরের অভিযোগ তুলেছেন।”
সরকারি কনফারেন্স রুমে বিদ্যুৎ ও এসি ব্যবহার করে রাতে খেলা দেখার আয়োজন আইনের ব্যত্যয় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে কথা বলাই ভালো হবে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। পরে বিষয়টি শুনেছি। ওই সাংবাদিক মোবাইল কোর্টের জরিমানা কমানোর তদবিরে এসেছিলেন। কিন্তু মোবাইল কোর্টে জরিমানা কিংবা দণ্ড হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকে না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি বলার পর তিনি খেলা দেখার ভিডিও ধারণ করেন এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।”
ইউএনও বলেন, সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছেন। সেখানে মারধরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, খেলা দেখার সময় ওই সাংবাদিকের সেখানে এসে এভাবে আচরণ করা উচিত হয়নি।
সরকারি কনফারেন্স কক্ষে খেলা দেখার আয়োজন আইনের ব্যত্যয় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, দেশজুড়ে বিশ্বকাপের উন্মাদনা চলছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ সবাই মিলে দেখলে আনন্দ হয়। ২০টি জায়গায় ২০টি টেলিভিশন চালানোর চেয়ে ২০ জন একসঙ্গে বসে খেলা দেখলে বরং বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। গতকাল বৈরী আবহাওয়া ছিল। এখানে এসি চালানো হয়নি। উপজেলার স্টাফ ও তাদের কয়েকজন পরিবারের সদস্য মিলে খেলা দেখছিলেন।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
একপর্যায়ে নিজের কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখান সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম।
ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১১টা ১১ মিনিটে ক্যামেরাম্যান মোজাহারসহ আরো তিনজনকে নিয়ে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম উপজেলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওঠেন। অন্য তিনজনকে বাইরে রেখে তিনি একাই কনফারেন্স কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিহিত সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনের সঙ্গে মোবাইল টিপতে টিপতে কথা বলেন। প্রায় এক মিনিট পর দুজন একসঙ্গে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে বাইরে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের নিয়ে কনফারেন্স কক্ষ থেকে কিছুটা দূরে কথা বলতে দেখা যায়।
এরপর আবদুল্লাহ আল আমিন একাই কনফারেন্স কক্ষে ফিরে গিয়ে খেলা দেখতে বসেন। কয়েক সেকেন্ড পর, রাত ১১টা ১৬ মিনিটে দিদারুল ইসলাম আবার কক্ষে প্রবেশ করে তার কাছাকাছি একটি চেয়ারে বসেন। রাত ১১টা ২৮ মিনিটে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তিন মিনিট পর, রাত ১১টা ৩১ মিনিটে আবার ফিরে এসে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর পাশে বসেন। এরপর দুজনকে কথা বলতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর আর্জেন্টিনার জার্সি পরা কয়েকজন তাদের ঘিরে দাঁড়ান। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জটলা বাড়তে থাকে। রাত ১২টা পর্যন্ত কক্ষে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
ফুটেজে আরো দেখা যায়, রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন, সাংবাদিক দিদারুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন ভবনের নিচতলায় কথা বলছেন। রাত ১২টা ৪৩ মিনিটে দিদারুল ইসলাম সেখান থেকে চলে যান।
তবে রাত ১২টা থেকে ১২টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত মোট ৩৭ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজ সাংবাদিকদের দেখানো হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ওই ফুটেজ মোবাইলে সংরক্ষিত আছে এবং তা দেখানো হবে।
যা আছে মুচলেকায়
সাংবাদিক দিদারুল ইসলামের কাছ থেকে নেওয়া মুচলেকার একটি অনুলিপি এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
মুচলেকায় লেখা রয়েছে, “আমি মো. দিদারুল ইসলাম মুভিবাংলা টেলিশিনের ঢাকা উত্তর এর সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত আছি। আমি এসিল্যান্ড সাভার এর নিকট অবৈধ গ্যাস আল আকশা ফ্যাক্টরির আসামীপক্ষের পক্ষ হয়ে তদবিরে এসেছি এবং গোপনে কিছু ভিডিও ধারণ করি এবং আর কোনোদিন এমন ভুল করব না, যা আমি অন্যায় করেছি।”
দিদারুল ইসলামের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সাইদুল ইসলাম বলেন, “দিদারুল ইসলাম নামে এক সাংবাদিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমি আজ হাসপাতালে নেই। দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তার শরীরে তেমন কোনো আঘাত নেই। আমি আগামীকাল হাসপাতালে গিয়ে তাকে নিজে চোখে দেখে বিস্তারিত বললে ভালো হবে।”








