৬৫৬ হিজরী মোতাবেক ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে আরতুগ্রুলের ছেলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমানের জন্ম। এটা সেই সময় যখন হালাকু খান ও তার মঙ্গোল বাহিনীর হাতে আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদসহ মুসলমানদের সমৃদ্ধ শহরগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। উসমান খান ছোটবেলা থেকেই মুসলমানদের চরম বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা দেখেছেন। তার বাবার প্রতিষ্ঠিত নবীন সালতানাতের সীমানার চারপাশেও ছিল ক্রুসেডারদের ছোট ছোট রাজ্যের উপস্থিতি।
সেই সময় মুসলমানরা ভোগ-বিলাস ও পাপাচারে ডুবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের ওপর মঙ্গোলদের চাপিয়ে দিয়েছিলেন। তারা মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী বড় শহরগুলোতে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিল। মুসলমানদের এই কঠিন সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমানের জন্ম। এখানে একটি সূক্ষ্ম শিক্ষণীয় দিক রয়েছে—তা হলো, মুসলমানদের ক্ষমতায়ন বা প্রতিষ্ঠার শুরুটা হয় চরম দুর্বলতা ও পতনের শেষ বিন্দু থেকে। এটিই মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই ফেরাউন তার দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিল এবং সেখানকার অধিবাসীবৃন্দকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে তাদের একটি শ্রেণীকে হীনবল করেছিল, তাদের পুত্রদেরকে সে হত্যা করত এবং নারীদেরকে সে জীবিত রাখত। সে তো ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। আমি ইচ্ছা করলাম, সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে; তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে ও দেশের অধিকারী করতে, দেশের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে; এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা তাদের নিকট থেকে তারা আশংকা করত। (সুরা কাসাস: ৪-৬)
একজন নেতা, সমরনায়ক ও শাসক হিসেবে উসমান গাজির কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরছি:
দৃঢ় ইমান
উসমান গাজি ছিলেন দৃঢ় ইমানের অধিকারী ধর্মপ্রাণ মুসলমান। ইসলামের প্রচার-প্রসারকে তিনি নিজের পবিত্র দায়িত্ব মনে করতেন। তার রাজনীতি ও যুদ্ধগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামের পতাকা সমুন্নত করা। ঐতিহাসিক আহমেদ রফিক তাঁর ‘তারীখে আম কবীর’ বিশ্বকোষে উসমানের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, উসমান অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছিলেন। তিনি মনে করতেন ইসলামের প্রচার ও প্রসার তার একটি পবিত্র দায়িত্ব। উসমান তার সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ক্ষমতার লোভে নয় বরং ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে।
কাদির মিসিরোগ্লু বলেন, উসমান গাজি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, জীবনে তার প্রধান কর্তব্য হলো আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। তিনি তার সব রকম সামর্থ্য ও শক্তি দিয়ে এই কর্তব্য পালনে নিমগ্ন ছিলেন।
ন্যায়পরায়ণতা
উসমানীয়দের ইতিহাস নিয়ে লেখা অধিকাংশ তুর্কি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, ৬৮৪ হিজরী মোতাবেক ১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে কারাজাহিসার শহরটি জয়ের পর আরতুগ্রুল তার ছেলে উসমানকে সেখানকার বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন।
একবার এক মামলায় উসমান একজন তুর্কি মুসলিমের বিরুদ্ধে একজন বাইজেন্টাইন খ্রিস্টানের পক্ষে রায় দেন। এতে সেই বাইজেন্টাইন ব্যক্তিটি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে উসমানকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমি আপনার ধর্মাবলম্বী না হওয়া সত্ত্বেও আপনি কীভাবে আমার পক্ষে রায় দিলেন?
উসমান উত্তর দিয়েছিলেন, আমি কেন আপনার পক্ষে রায় দেব না, অথচ আমরা যাঁর ইবাদত করি সেই আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে ফিরিয়ে দিতে। আর তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। (সুরা নিসা: ৫৮)
এই ঘটনা ওই ব্যক্তি ও তার পুরো গোত্রের ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়েছিল।
চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা
তিনি চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। বাইজেন্টাইন দুর্গ ‘উলুবাদ’-এর আমীর উসমানীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার সময় শর্ত দিয়েছিলেন যে, কোনো মুসলিম উসমানীয় সৈন্য যেন সেতুর ওপর দিয়ে দুর্গের ভেতরে প্রবেশ না করে, উসমান সেই শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন এবং তাঁর পরবর্তী বংশধরেরাও তা মেনে চলেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা প্রতিশ্রুতি পূরণ করো, নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। (সুরা ইসরা: ৩৪)
সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব
উসমান গাজির সংস্পর্শে এসে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বুরসা শহরের সেনাপতি আকরিনোস উসমান গাজির সংস্পর্শে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। সুলতান উসমান তাকে 'বে' উপাধিতে ভূষিত করেন এবং পরবর্তীতে তিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান সেনাপতিতে পরিণত হন।
বহু মুসলমান দল ও গোষ্ঠীও তার নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের প্রতি আস্থাশীল হয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল। যেমন ‘গাজিয়ানে রুম’ ছিল এমন এক মুসলিম যোদ্ধা দল যারা আব্বাসীয় আমল থেকেই রোমান সীমান্তে পাহারায় নিয়োজিত থাকত এবং মুসলমানদের ওপর রোমানদের আক্রমণ প্রতিহত করত। পরবর্তীতে তারা উসমান গাজির সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়।
বীরত্ব
৭০০ হিজরী মোতাবেক ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে যখন বুর্সা, মাদানোস, আদ্রেনোস, কেতে এবং কেস্তেলের খ্রিস্টান শাসকরা উসমান গাজির বিরুদ্ধে একটি ক্রুসেডার জোট গঠনের করে উসমান গাজির নবীন সালতানাতটিকে ধ্বংস করতে তৎপর হয়, তখন উসমান তার সৈন্যদের নিয়ে স্বয়ং সম্মুখে অগ্রসর হন এবং নিজেই যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ওই যুদ্ধে তিনি এমন বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন যা রূপকথার মতো আজো তুর্কিদের মুখে মুখে ফেরে।
ধৈর্য
উসমান গাজি অত্যন্ত ধৈর্যশীল ছিলেন। সফলতা অর্জনের জন্য বছরের পর বছর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন, হতাশ হতেন না। ৭১৭ হিজরী মোতাবেক ১৩১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি বুরসা শহর জয় করেন বহু বছরের অবরোধের পর। বুরসা দুর্গের প্রধান সেনাপতি আকরিনোসের সাথে তার তীব্র লড়াই হয়েছিল, অবশেষে আকরিনোস আত্মসমর্পণ করেন এবং শহরটি উসমানের হাতে তুলে দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো, সীমান্ত প্রহরায় অটল থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যেন তোমরা সফলকাম হতে পারো। (সুরা আলে ইমরান: ২০০)
মহান আল্লাহ ও পরকালের প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাসের কারণে উসমানের চরিত্র ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। বীরত্ব তার ন্যায়পরায়ণতাকে প্রভাবিত করেনি, কর্তৃত্ব তার দয়াকে ম্লান করেনি এবং নেতৃত্ব ও সম্পদ তার বিনয় কেড়ে নেয়নি। ফলে তিনি আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনের উপযুক্ত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা উসমানকে সঠিক দূরদর্শিতা, রণকৌশল, বিপুল সৈন্যবল দানের মাধ্যমে শাসন পরিচালনার সক্ষমতা ও ক্ষমতা অর্জনের উপায়গুলো দান করেছিলেন।
আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসার কারণে তলোয়ারের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের পাশাপাশি ইমান ও ইহসানের মাধ্যমে মানুষের অন্তর জয় করতেও সচেষ্ট ছিলেন তিনি। তিনি যখনই কোনো রাষ্ট্র বা শহর জয় করতেন, ওই শহরের অধিবাসীদের সত্য ও ইমানের দাওয়াত দিতেন। সত্য ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হতেন।
তথ্যসূত্র:
- ১. আদ-দাওলাতুল উসমানিয়্যাহ: আওয়ামিলুন নুহুদ ওয়া আসবাবুস সুকুত, আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী
- ২. জাওয়ানিবু মুদিয়াহ ফী তারীখিল উসমানিয়্যীন, যিয়াদ আবু গানিমাহ
- ৩. আল-ফুতুহুল ইসলামিয়্যাহ আবরাল উসূর, ড. আবদুল আজীজ আল-উমরী
- ৪. তারীখু সালাতীনী আলি উসমান, আল-কারমানী
- ৫. আস-সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ, আব্দুস সালাম আব্দুল আজীজ
উৎস: আল জাজিরা
ওএফএফ








