বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের নিয়ে নৈশভোজ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ আয়োজনে শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ই হয়নি; উঠে এসেছে শরিকদের প্রত্যাশা, হতাশা ও মূল্যায়নের দাবি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্নও।
সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শরিক দলের নেতাদের জানান, রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ততার কারণে এতদিন তাদের সঙ্গে বসা হয়নি। সেই সঙ্গে আশ্বাস দেন, এখন থেকে নিয়মিত বৈঠক হবে।
ফেয়ারওয়েল নয়, ওয়েলকাম ডিনার
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক নেতা জাগো নিউজকে জানান, শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আজকে আমাদের ফেয়ারওয়েল ডিনার কি না?’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই না, এটা ওয়েলকাম ডিনার। রাষ্ট্রীয় কাজে অনেক ব্যস্ততার কারণে বসা হয়নি। এখন থেকে নিয়মিত বসা হবে।’
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। পরে সবাইকে নিয়ে নৈশভোজে অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নৈশভোজ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান/ছবি: পিএমও
সৌহার্দ্যের সঙ্গে ছিল হতাশা প্রকাশ
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, দলের সহ-সভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান ও আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম।
অনুষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, মাহমুদুর রহমান মান্না শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, তার সামনে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের মতো রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও শরিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন ইসলামি দলের নেতা অভিযোগ করেন, মন্ত্রিসভায় বামপন্থি ও তরুণ নেতাদের স্থান দেওয়া হলেও ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন দলগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ইসলামি শক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। এতে নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন
শরিকদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, বিভেদ নেই: তারেক রহমান
শরিকদের মূল্যায়নের আশ্বাস
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মিত্রদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজ করেছেন। এতে শরিক নেতারা সম্মানিত বোধ করছেন।
গণঅধিকার পরিষদের নেতা আবু হানিফ জানান, শরিকরা তৃণমূলে বিএনপির একক আধিপত্যের কারণে সৃষ্ট বিরোধ, যুগপৎ আন্দোলনের বাস্তবতা ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে শুনে শরিকদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে অতীতের মতোই দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে কোনো বিভেদ তৈরি হয়নি।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এটি মূলত শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন ছিল। ক্ষমতায় না থাকা ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, কয়েকজন নেতা সরকারে অংশীদার হওয়ার প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেছেন।
নৈশভোজ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান/ছবি: পিএমও
নিয়মিত বৈঠক হবে
এ নিয়ে কথা হলে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মহাসচিব আব্দুল মতিন সউদ জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে এখন থেকে দুই-এক মাস পরপর শরিকদের সঙ্গে তিনি বসবেন।
সংসদ সদস্য শাহাদাৎ হোসেন সেলিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘১৫ বছর যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম, তারাই একসঙ্গে পথ চলবো। গুপ্ত বা কোনো স্বৈরাচারের সঙ্গে আমরা ঐক্য করবো না। যুগপৎ আন্দোলনে যারা ছিলেন, তাদের নিয়েই আগামীতে পথ চলবো।’
ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শরিকদের সঙ্গে বসলো বিএনপি। তবে নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করেছিলেন তারেক রহমান ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
আরও পড়ুন
শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভোজের মেনুতে সবজি-ভাত-ডাল-মুরগি
নৈশভোজে ৪১ দলের ১৮৪ জন
নৈশভোজে ৪১টি রাজনৈতিক দলের ১৮৪ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও জমিয়তে ইসলাম অংশ নেয়নি।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি তানিয়া রব বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ পেলেও তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। এ বিষয়ে কারণ উল্লেখ করে পাল্টা চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যুগপৎ আন্দোলনে প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক দল যুক্ত ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শরিকদের জন্য ডজনখানেক আসন ছেড়ে দেয়। বর্তমানে সরকারে বিএনপির সঙ্গে রয়েছে গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) প্রতিনিধিরা।
যদিও নির্বাচনে শরিকদের অধিকাংশ প্রার্থী পরাজিত হন। নিজ নিজ প্রতীকে জয় পান মাত্র তিনজন- গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ। তাদের মধ্যে জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুর মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। অন্যদিকে এনডিএম ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হওয়া ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
কেএইচ/একিউএফ








