লাতিন দেশ ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর ৪ দিন পার হয়ে গেছে। সময় যত গড়াচ্ছে, ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকেপড়াদের উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত ক্ষীণ হচ্ছে। স্বজনরা ভবনের সামনে এসে ভিড় করছেন। কাউকে উদ্ধার করা হলেই এগিয়ে গিয়ে দেখছেন তাদের আপনজন কিনা। অনেক সময় ফিরছে নিথর দেহ। কাছে গিয়ে তাকাতেই কোনো কোনো স্বজন জ্ঞান হারাচ্ছেন; কেউ কেউ ভেঙে পড়ছেন কান্নায়। কেউ ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার সাড়াহীন দেহটিকে বারবার স্পর্শ করছেন-যদি বেজে ওঠে প্রাণের স্পন্দন!
উদ্ধার অভিযানে বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের পাশাপাশি নিরলস কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ অবরোধের কারণে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি নড়বড়ে। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও দুর্বল। এ অবস্থায় ভূমিকম্পে আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি। অনেক স্থানে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র খুলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক লোকজন গতকালও খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করেন। রোববার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ধ্বংসস্তূপের ভেতর এখনো কিছু মানুষকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। ভেনিজুয়েলায় জাতিসংঘের প্রধান জিয়ানলুকা র্যাম্পোল্লা জানান, তার দল আজ লা গুয়াইরা পরিদর্শন করেছে। তারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে জীবিত অবস্থায় পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরও কয়েকটি দল কাজ করছে।’ তিনি জানান, সম্প্রতি বিদেশ থেকে অতিরিক্ত উদ্ধারকারী দল ভেনিজুয়েলায় এসে পৌঁছেছে।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের কাছাকাছি লা গুয়েরা এলাকা। সেখানে অনেক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। উদ্ধারে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি দল পাঠিয়েছে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকর্মীরা ভেনিজুয়েলার ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারাবেলিয়াডা এলাকাও। সেখানে মরদেহের স্তূপে রয়েছে নবজাতকদের নিঃসাড় দেহও।
ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ওই এলাকাটি সংরক্ষিত। পুরো এলাকায় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। দুর্গতদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি জানান, বুধবার সন্ধ্যায় ভূমিকম্পের পর অন্তত ৪৩০টি পরাঘাত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন, বিশেষ করে লা গুয়েরায় এমন দৃশ্য বেশি দেখা যাচ্ছে। ভেনিজুয়েলার কর্মকর্তারা বলছেন, ৩ হাজারের বেশি মানুষ বাইরে থাকছেন।
শনিবার সকালে ৭৫ বছর বয়সি অবসরপ্রাপ্ত নারী নাহতিয়া সানচেজ জানান, ভূমিকম্পের পর থেকেই তিনি কারাকাস শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘লা কানডেলারিয়া’ চত্বরে অবস্থান করছেন। ভেনিজুয়েলার অনেক নাগরিকের মতোই তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি জানান, তার একমাত্র সন্তান ও নাতি-নাতনিরা এখন আর ভেনিজুয়েলায় থাকেন না।
কয়েকদিন ঠিকমতো ঘুমাতে না পারার ক্লান্তি তার চেহারায় স্পষ্ট ছিল। একটি কার্ডবোর্ডের টুকরোই ছিল তার অস্থায়ী বিছানা; একটি ব্যাগ, যা বালিশ হিসাবে তিনি ব্যবহার করেছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল একটি ব্যানার, যাতে নিকোলাস মাদুরোর ছবি ছিল, কয়েক মাস আগে যাকে মার্কিন বাহিনী কারাকাসে নিজ বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়েছিল। কাছাকাছিই চার তরুণ একটি পুরোনো তোশক ভাগাভাগি করে পালাক্রমে ঘুমাচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সি গ্যাব্রিয়েল মেজিয়াস জানান, তিনি নিজের চোখের সামনেই তার বাড়ির দেওয়াল ধসে পড়তে দেখেছিলেন। মা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি সেখানে একাই থাকতেন। বুধবারের পর থেকে ওই বাড়িতে ঘুমাতে তার ভয় লাগছে। তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্প শুরু হলে দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসি। পথচারী সবাই তখন অত্যন্ত আতঙ্কিত ও উত্তেজিত ছিল।’
বুধবার সন্ধ্যায় ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মুহূর্তেই ধসে পড়ে শত শত ভবন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, নিখোঁজের সংখ্যা কমপক্ষে ৬৮ হাজার ৯০০ জন।
মাচাদোর ওপর বিরক্ত যুক্তরাষ্ট্র
হোয়াইট হাউজের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর ভেনিজুয়েলায় ফিরতে সহায়তার জন্য অনুরোধ করায় নির্বাসিত ভেনিজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোর ওপর মার্কিন কর্মকর্তারা বিরক্ত হয়েছেন। তারা জানান, মাচাদোর একাধিক অনুরোধ ছিল অসময়ের; এক কর্মকর্তা তো একে ‘রাজনৈতিক চমক’ বা ‘পলিটিক্যাল স্টান্ট’ হিসাবে অভিহিত করেছেন। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও অনেক দেশ ভেনিজুয়েলায় ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার ওপর মনোযোগ দিয়েছে।
মাচাদো বেশ কয়েক মাস ধরেই ভেনিজুয়েলায় ফিরতে চাইছেন। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা জানান, তারা তার এই ইচ্ছাকে সমর্থন করেন। তবে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন- তারা চান না তিনি অদূর ভবিষ্যতে দেশে ফিরে আসুন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করতে এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মাধ্যমে তিনি ডিসেম্বরে ভেনিজুয়েলা ত্যাগ করেন; পরে তিনি সেই পুরস্কার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রদান করেন। জানুয়ারি মাসে মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর মাচাদো দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাকে এমনটা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।








