সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও বিশ্বম্বরপুর উপজেলার আলোচিত নদী যাদুকাটা। সীমান্তের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে এর অবস্থান। কনস্ট্রাকশন বালুর (নির্মাণকাজে ব্যবহৃত) জন্য এই নদীর খ্যাতি অনেক। শুষ্ক মৌসুমে স্বচ্ছ পানির জন্য এলাকাটি পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয়। প্রতিবছর নদীর একটি অংশ ইজারা দেওয়া হয়। এই সুযোগে কম সময়ে বালুখেকোরা অতিরিক্ত বালু তুলতে ব্যবহার করে অবৈধ ড্রেজার। দেশি পদ্ধতির এই ড্রেজার (স্থানীয়ভাবে বোমা মেশিন নামে পরিচিত) ব্যবহারে নদীটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রতি রাতে শতাধিক ড্রেজার চালানো হয়। পাড় কেটে ৩৭ মিটার প্রস্থ নদীটি এখন কোনো কোনো স্থানে কয়েক কিলোমিটার হয়ে গেছে। আর গত দেড় মাসে নদীর আকৃতি বেড়েছে অন্তত ৩ কিলোমিটার। এতে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শত শত বসতি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যে দলই ক্ষমতায় আসে, সেই দলের নেতাকর্মীরা বালুমহালের ইজারা নিয়ে ভোগদখল করেন। তবে এবারই প্রথম ভোগদখলে একাট্টা হয়েছে বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তারা পদে পদে অনিয়ম করছেন। এমনকি ইজারা বন্ধ করে ড্রেজার দিয়ে বালু লুটের মহোৎসব চালাচ্ছেন। অবাধে বোমা মেশিন চালাতে সবার মুখ বন্ধ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়েও যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। তারা রাতের অন্ধকারে ড্রেজার চালায়। বেশ কয়েকবার কিছু লোককে আটক করে জেল-জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এবার পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে চিঠি লিখেছি। এসব অভিযান চালাতে বাজেটও চাওয়া হয়েছে।’

বিএনপি-আ.লীগ নেতাদের মিলেমিশে ব্যবসা : আওয়ামী লীগ আমলের শেষ অর্থবছরে যাদুকাটার দুই বালুমহালের ইজারা মূল্য ছিল ৩২ কোটি টাকা। একই বালুমহাল গত বছর বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতারা এক হয়ে ১০৬ কোটি টাকায় ইজারা নিয়েছেন। এই টাকা দুই রাজনৈতিক দলের আট নেতা পরিশোধ করেছেন। বহুল আলোচিত এই দুই বালুমহালে কে কত টাকা শেয়ার নিয়েছেন তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি শাহ রুবেল নিয়েছেন ১১ শতাংশ, তাহিরপুরের আওয়ামী লীগ নেতা সোয়ালা গ্রামের মোবারক হোসেন ২১ শতাংশ, সুনামগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচনে প্রথম ধানের শীষ প্রতীক পাওয়া (পরে পরিবর্তন) আনিসুল হকের ছোট ভাই আনোয়ারুল হক সাড়ে ১৯ শতাংশ, তার ভগিনীপতি নাঈম ৫ শতাংশ, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ী মোস্তাক সাড়ে ১৬ শতাংশ, একই আসনে সংসদ-সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের সমর্থক নাছির উদ্দিন ১২ শতাংশ, তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি নেতা জুনাব আলী সাড়ে ৮ শতাংশ এবং তাহিরপুরের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা খসরু নিয়েছেন সাড়ে ৬ শতাংশ। বালুমহালটি সমঝোতার ভিত্তিতে ইজারা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেন ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেল। তিনি জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত। এই শাহ রুবেল ছাতক উপজেলা সীমান্তে আরও একটি বালুমহাল ২৫ কোটি টাকায় ইজারা নিয়েছেন। তাকে প্রশ্রয় দিয়ে বিনা পুঁজিতে লাভ নেন বিএনপির প্রভাবশালী দুই শীর্ষ নেতা। বালু লুট নিয়ে এর আগের প্রতিবেদনে তাদের নাম ছাপা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, যাদুকাটা নদীতে দুটি বালুমহাল (যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২) ও একটি ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারিসহ তিনটি মহাল আছে। এগুলোকে কেন্দ্র করে দুটি গ্রুপ সক্রিয়। যাদুকাটা নদীর দুটি স্থানকে বালুমহালের জন্য ভাগ করে ইজারা দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের খনিজসম্পদ বিভাগ বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ইজারা দেয়। ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারিতে প্রায় ১২১ হেক্টর বা প্রায় ৩০০ একর এলাকা নির্দিষ্ট রয়েছে। এর সীমানা চালিয়ারঘাট, পুরান লাউর, ঘাঘটিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মৌজা নিয়ে গঠিত। ১৪৩২ বাংলা সনের ১ বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত (১৪ এপ্রিল ২০২৫-১৩ এপ্রিল ২০২৬) এক বছর মেয়াদে যাদুকাটা-১ বালুমহালটি ইজারা পান তাহিরপুর উপজেলার মেসার্স তাহিন স্টোন ক্রাশারের মালিক স্থানীয় বিএনপি নেতা নাছির মিয়া। এই বালুমহালের জন্য সর্বোচ্চ দর উঠে ৩০ কোটি টাকা। ভ্যাট ও উৎসেকর হিসাবে এখানে আরও যোগ হয় ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মোট ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকায় ইজারা সাব্যস্ত হয়। নদীর কতটুকু অংশ বালুমহাল, সেই সীমানাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।

নথিপত্রে দেখা গেছে, তাহিরপুর উপজেলার চালিয়াঘাট মৌজার ১০০২ ও ১০০৩ দাগে ৮৯ একর ৫৬ শতক এলাকা যাদুকাটা-১ এবং একই উপজেলার পুরান লাউড় ও চালিয়াঘাট মৌজায় কয়েকটি দাগে ২২ একর ৫৪ শতক নদীর এলাকাজুড়ে যাদুকাটা-২ বালুমহাল। এটির সর্বোচ্চ দর উঠে ৫৫ কোটি টাকা। একইভাবে ভ্যাট ও উৎসেকর হিসাবে এখানে যোগ হয় ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সর্বমোট ৬৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় যাদুকাটা-২ বালুমহালটি ইজারা পান জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া এলাকার শাহ রুবেল আহমেদ। ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের দরপত্র বাছাই কমিটির সভায় বিএনপি ও ছাত্রলীগের দুই নেতা ইজারা পেয়েছেন। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর শাহ রুবেল ও নাছির মিয়া লিখিতভাবে বালুমহালের ইজারা বুঝে নেন।

শতকোটি টাকা ইজারা বন্ধ : ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য ১৯ জানুয়ারি দুই বালুমহাল ইজারার দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা প্রশাসন। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি দরপত্র গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ৮৯ একর ৫৬ শতক এলাকা চিহ্নিত করে যাদুকাটা-১ বালুমহালের ২৩ কোটি ২৮ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা এবং ৩৯৮ একর ৪ শতক এলাকার আয়তনে যাদুকাটা-২ বালুমহালের ক্ষেত্রে ৩৯ কোটি ৪৬ লাখ ২১ হাজার ৩৩৪ টাকা দর সাব্যস্ত করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই দুটি বালুমহাল ১৪৩২ বাংলা সনে ১০৬ কোটি টাকায় ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে ১৪৩৩ বাংলা সনের ইজারা স্থগিত করতে হাইকোর্টে রিট করেন যাদুকাটার দুই ইজারাদার। তাদের দাবি, এক বছরের জন্য বালুমহাল ইজারা নিলেও তাদের দখল দেওয়া হয়েছে পাঁচ মাস পর। কিন্তু নথিপত্র বলছে, সময়মতোই তাদের বালুমহাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। রিটের পক্ষে নতুন ইজারা বন্ধের আদেশ দেন আদালত।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে ইজারা পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা আজাদ হোসেনের ব্যবসায়ী পার্টনার খুরশীদ আলম বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারির সীমানা নির্ধারণ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। আদালত সিদ্ধান্ত দেন, মৌজা একই হতে পারে, কিন্তু দাগ ভিন্ন হলে পৃথক বালুমহাল বা কোয়ারি বৈধ। জাদুকাটা-১ ও জাদুকাটা-২ পৃথক দাগে সৃষ্টি হওয়ায় সেগুলো বৈধ। ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি পৃথক দাগে থাকায় সেটিও বৈধ। ফলে একটির কার্যক্রম অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত সুপ্রিমকোর্টও বহাল রাখেন। এই রিটের কারণে প্রায় ৫ মাস দুই বালুমহালের আনুষ্ঠানিকভাবে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে ওই সময়ের জন্য ইজারার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেনি। এই সুযোগে ইজারাদার নদীর পাড় কেটে ফেলেছে অন্তত তিন কিলোমিটার।

কোস্ট গার্ড চান এমপি : পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের এমন নজিরবিহীন নীরবতায় আস্থা হারিয়েছেন এলাকার সদস্য মো. কামরুজ্জামান কামরুল এমপি। নদীর পাড় রক্ষায় এবার কোস্ট গার্ডের সহায়তা চেয়ে ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি। ‘দুষ্কৃতকারীদের’ কালো থাবা থেকে যাদুকাটা নদীর দুই তীরসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকা রক্ষায় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইজারাদার নাছির মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। রোববার বিকালে ফোন রিসিভ করে তিনি ‘এখন ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব’ জানিয়ে লাইন কেটে দেন। অপর ইজারাদার শাহ রুবেলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।