সকাল থেকে রাজধানীতে থেমে থেমে বৃষ্টি। সন্ধ্যার পর বৃষ্টি একটু কমলেও রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত নিউমার্কেট এলাকার সড়কে তখনও হাঁটুসমান পানি। সকাল থেকে তৈরি হওয়া জলাবদ্ধতা ১০ ঘণ্টা পরও না সরায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। এতে অচল হয়ে পড়ে এলাকার স্বাভাবিক জনজীবন। বন্ধ হয়ে যায় অধিকাংশ দোকান, ব্যবসা গুটিয়ে নেন হকাররা, চরম দুর্ভোগে পড়েন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা।
রোববার (১২ জুলাই) বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, আজিমপুর পুরোনো কবরস্থান থেকে নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেট অতিক্রম করে আরও কিছু দূর পর্যন্ত পুরো সড়ক পানিতে তলিয়ে রয়েছে। পানির ওপর ভাসছে ময়লা-আবর্জনা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সড়কবাতি জ্বলে উঠলেও ব্যস্ত সড়কে নেই চিরচেনা কোলাহল। মানুষের ভিড়, যানবাহনের দীর্ঘ সারি কিংবা হকারদের হাঁকডাক—সবকিছু যেন জলাবদ্ধতার কাছে হার মেনেছে।
আরও পড়ুন
সড়কে জলাবদ্ধতা, বিকল হওয়া এড়াতে ফ্লাইওভারে ব্যাটারিচালিত রিকশা
নিউমার্কেটের বিপরীতে আজিমপুর গভর্নমেন্ট অফিসার্স কোয়ার্টারের সামনে ক্যাম্পাস-বনশ্রী-মেরাদিয়া রুটের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স’ লেখা দুটি বাস আটকে থাকতে দেখা যায়। একটি রিকশায় সিট পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় এক নারী যাত্রীকে হুডের ওপর পা তুলে বসে থাকতে হয়। আবার এক মোটরসাইকেল আরোহীকে হেলমেট মাথায় মোটরসাইকেল ঠেলে পানি পার হতে দেখা যায়।
টানা বৃষ্টিতে সড়কে জলাবদ্ধতা। হাঁটুসমান পানি ঠেলে রিকশা চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন চালকরা/ সন্ধ্যায় নিউমার্কেট এলাকা থেকে মনিরুজ্জামান উজ্জ্বলের তোলা ছবি
জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে দেওয়া হলেও তাতে খুব একটা সুফল মিলছিল না। কুয়েত মৈত্রী হলের সামনে থেকে নিউমার্কেট হয়ে নীলক্ষেতমুখী সড়কজুড়েই তখনও পানি জমে ছিল।
আরও পড়ুন
ঢাকায় ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি, মৌসুমের রেকর্ড
সকাল থেকেই পানি পারাপারের জন্য ভ্যানগাড়ি চলাচল করছে। যাত্রীপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া নিয়ে মানুষকে সড়ক পার করে দেওয়া হচ্ছে। প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও প্যাডেলচালিত রিকশা চলাচল করলেও সেগুলোর সংখ্যা ছিল খুবই কম। অনেকেই প্রয়োজনের তাগিদে ভাড়া দিয়ে পার হচ্ছেন, আবার অনেকে কাপড় ভিজিয়েই গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
দিনভর বৃষ্টির সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা। সকালে কিছু দোকান খুললেও বিকেলে মার্কেটের প্রায় সব গেট তালাবদ্ধ দেখা যায়। মার্কেটের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় নিরাপত্তাকর্মীদের খালি মার্কেট পাহারা দিতে দেখা যায়।
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক, শিক্ষা ও জনসমাগম কেন্দ্র নিউমার্কেটে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। বছরের পর বছর সংস্কারকাজ চললেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় প্রতিটি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে
বিজিবি ৩ নম্বর গেট থেকে কুয়েত মৈত্রী হল, আজিমপুর কবরস্থান ও নিউমার্কেটসংলগ্ন ফুটপাতে প্রতিদিন শত শত হকার ব্যবসা করেন। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে রোববার তাদের কাউকেই দোকান খুলতে দেখা যায়নি। ফলে দিন আনা দিন খাওয়া এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।
ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ সড়ক। পানিতে ডুবে ধীরগতিতে চলাচল করছে ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন/ সন্ধ্যায় নিউমার্কেট এলাকা থেকে মনিরুজ্জামান উজ্জ্বলের তোলা ছবি
শুধু ব্যবসা নয়, আবাসিক এলাকাতেও নেমে আসে দুর্ভোগ। আজিমপুর কবরস্থানের বিপরীতে আইয়ুব আলী কলোনির অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। পানির মোটর চালানো সম্ভব না হওয়ায় রান্নাবান্না প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের অনেক হোটেলও বন্ধ থাকায় অনেক বাসিন্দা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেয়েছেন।
আরও পড়ুন
জলাবদ্ধতার প্রভাব ঢামেকেও, জরুরি বিভাগে রোগী কমেছে ২০ শতাংশ
আইয়ুব আলী কলোনির বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কিছুদিন আগে সংস্কারের নামে রাস্তা কাটা হয়েছিল। এখনো ঠিকভাবে কাজ শেষ হয়নি। তার ওপর বৃষ্টিতে পুরো এলাকায় চলাচল আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।’
কুয়েত মৈত্রী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আফসানা খানম বলেন, ‘একটু বেশি বৃষ্টি হলেই নিউমার্কেটের সামনের সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। গত চার বছরে বহুবার সংস্কারকাজ হতে দেখেছি। কিন্তু সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।’
আজিমপুর নতুন পল্টন এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, নিউমার্কেট পোস্ট অফিসের পাশের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকেও বৃষ্টির সময় ময়লা-আবর্জনা পানিতে ভেসে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এলাকায় ছোট ভ্যানে সংগ্রহ করা বর্জ্য এখানে এনে জমা করা হয়, পরে সিটি করপোরেশনের বড় গাড়িতে তা মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে নেওয়া হয়। কিন্তু ভারী বৃষ্টি হলেই সেই বর্জ্যের একটি অংশ পানিতে ভেসে সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন
টানা বৃষ্টিতে বিএনপি কার্যালয়ে পানি, নেতাকর্মীদের রিকশায় চলাচল
তার ভাষায়, এত গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায় এমন একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ কতটা যৌক্তিক, তা সংশ্লিষ্টদের নতুন করে ভাবা উচিত।
নিউমার্কেট এলাকায় সড়কজুড়ে থইথই পানি/ ছবি: মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক, শিক্ষা ও জনসমাগম কেন্দ্র নিউমার্কেটে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। বছরের পর বছর সংস্কারকাজ চললেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় প্রতিটি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। রোববারের চিত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার অনেক পরও সড়কে জমে থাকা পানি যেন নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
এমইউ/এমআইএইচএস/








