বিশ্বমঞ্চে মূল ফাইনালের ঠিক আগের দিন, ফুটবলের জোয়ারে ভেসে গেল যশোর। ছোট্ট পায়ে বড় স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামে ৭ থেকে ১০ বছরের একঝাঁক খুদে ফুটবলার। শহরের আরএন রোড ক্রীড়া চক্রের মাঠে বসে জমকালো এই আসর। টুর্নামেন্টের নাম—‘রিপন অটোস জুনিয়র বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬’।

একেবারে বিশ্বকাপের আদলে তৈরি এই আসর দেখতে মাঠের চারপাশ জুড়ে ছিল দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। যেন মূল বিশ্বকাপের ফাইনালই নেমে এসেছিল যশোরের মাটিতে!

বিশ্বমঞ্চে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে, শনিবার সন্ধ্যায় যশোরের এই জুনিয়র ফাইনালেও লড়েছে আর্জেন্টিনা। তবে এখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। ৪০ মিনিটের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দেয়নি। তবে শেষ হাসিটা হেসেছে আকাশি-সাদারাই। উরুগুয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে জুনিয়র বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা।

ম্যাচ শেষে মাঠে খুদে খেলোয়াড়দের ট্রফি উঁচিয়ে উল্লাস যেন জানান দিল, মূল বিশ্বকাপেও বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা ছেড়ে কথা বলবে না! শিশুদের মোবাইল ও অনলাইনের আসক্তি কমিয়ে মাঠমুখী করতেই এমন আয়োজন বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। প্রায় মাসব্যাপী এই টুর্নামেন্টটিতে অংশ নেওয়া খুদে খেলোয়াড়রা যেমন খুশি; তেমনি বারবার এই ধরনের আয়োজনের দাবি তাদের।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিয়ান জানায়, ‘স্কুল-কোচিং শেষে বাসায় টেলিভিশন কিংবা মোবাইলে ইউটিউব, গেমস খেলে সময় পার হতো। কিন্তু আরএন রোডের জুনিয়র এই বিশ্বকাপ আমাদের অনেক আনন্দ দিয়েছে। এই ধরনের খেলা আরও হওয়া উচিত।’

নাছিমা বেগম নামে এক অভিভাবক জানান, ‘শহরে তো খেলার মাঠ নাই। ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজের মধ্যে শিশুদের নিয়ে এই ধরনের আয়োজন প্রশংসার দাবি রাখে। শিশুরা প্রবল আগ্রহ নিয়ে মাঠে এসেছে।’

দেশের শীর্ষ মোটরবাইক পার্টস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘রিপন অটোস’ এর পৃষ্ঠপোষকতায় জুনিয়র বিশ্বকাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আয়োজকরা জানান, বাছাই কার্যক্রম শেষে ২৪০ জন শিশুকে নিয়ে বিশ্বের জনপ্রিয় ১৬টি দেশের আদলে গঠন করা হয়েছিল ১৬টি দল। ১৬টি দলের দলীয় জার্সি ও পতাকার প্রতিনিধিত্বও করেছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠের চারপাশে বাংলাদেশসহ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্সসহ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া জনপ্রিয় ১৬টি দলের পতাকা উড়ছে। মাঠের চারপাশে দর্শকে ঠাসা। কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, কেউ বা ভুভুজেলা বাঁজাচ্ছে। অভিভাবকদের সঙ্গে শহরের বাসিন্দারা এই খেলা দেখছেন। দর্শকের এমন চাপ যে, কেউ বাসাবাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ছাদে বসেও এই খেলা উপভোগ করেছেন। খেলা পরিচালনায় ছিলেন রেফারি। রেফারিরাও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে মাঠে ভিএআর ব্যবহার করতেও দেখা গেছে। সবমিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি আর ভিন্ন আমেজ ছিল জুনিয়র বিশ্বকাপে।

জমজমাট ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। এসময় তারা বিজয়ী, রানার্স আপসহ ১৬টি দলের খেলোয়াড়দের মাঝে পুরস্কার তুলে দেন। জেলা পরিষদ প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন তার বক্তব্যে ক্রীড়াঙ্গনের স্থবিরতা দূর করা এবং শিশুদের মাঠমুখী করার ওপর বিশেষ জোর দেন। বিশেষ করে, খেলার সময়ে কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশ্বকাপের আদলে এই বিশ্বকাপ আয়োজন করায় আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান রিপন অটোস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইয়াজ উদ্দীন রিপন বলেন, আমরা বাংলাদেশসহ বিশ্বের জনপ্রিয় ফুটবলের ১৬টি টিম নিয়ে এই টুর্নামেন্ট শুরু করেছি। শিশুদের জন্য যদি আমরা সুন্দর খেলার পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারি, তবে তারা মাঠমুখী হবে। একটি সুস্থ ও গঠনমূলক বাংলাদেশের শুরুটা এভাবেই হতে পারে বলে আমি মনে করি।

মিলন রহমান/এফএ/জেআইএম