ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর দুলালবাড়ি গুচ্ছগ্রামে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে ভেঙে পড়ে আছে একমাত্র চলাচলের কাঠের সাঁকো। এতে ২৪০টি ভূমিহীন পরিবারের পাশাপাশি আশপাশের আরও কয়েকশ পরিবার কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, গর্ভবতী নারী, অসুস্থ রোগী ও কৃষকদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিঙি নৌকায় নদী পারাপার করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার খাগডহর চরবাহাদুরপুর গ্রামের ব্রহ্মপুত্র ও সুতিয়া নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা চর দুলালবাড়ি গুচ্ছগ্রামে প্রবেশের একমাত্র কাঠের সাঁকোটির মাঝের অংশ ভেঙে নদীর মধ্যে ঝুলে রয়েছে। সাঁকো দিয়ে চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা ছোট ডিঙি নৌকায় পারাপার করছেন। প্রতিবার নদী পার হতে গুনতে হচ্ছে ১০ টাকা ভাড়া।
জানা গেছে, ২০২০ সালে আশ্রয়ণ (গুচ্ছগ্রাম) প্রকল্পের আওতায় প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে চর দুলালবাড়িতে ২৪০টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। প্রতিটি পরিবারকে দুই শতাংশ জমিসহ টিনশেড ঘর দেওয়া হয়। এরপর থেকে গুচ্ছগ্রামে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল এই কাঠের সাঁকো।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ২৮ এপ্রিলের ভারী বৃষ্টিতে সাঁকোটির মাঝের অংশ ভেঙে যায়। এরপর থেকে গুচ্ছগ্রামসহ আশপাশের পাঁচ থেকে ছয়শ পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে। আশপাশে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে বিকল্প কোনো পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় সবাইকে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন নৌকায় নদী পার হয়ে খাগডহরের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে যেতে হয় তাদের। অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীতে ঢেউ কিংবা নৌকা না থাকায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ রোগী নিয়ে নৌকায় ওঠানামা করা খুবই ভয়ংকর। সন্ধ্যার পর নৌকা পাওয়া যায় না। মাঝরাতে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার কোনো উপায় থাকে না। আমরা সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, এ সাঁকো শুধু গুচ্ছগ্রামের মানুষ ব্যবহার করতেন না, আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষও এটি দিয়ে চলাচল করতেন। এখন সবাই কষ্টে আছেন। একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান হবে না।
গুচ্ছগ্রাম সমবায় সমিতির সহ-সভাপতি সুমন মিয়া বলেন, সাঁকো ভেঙে যাওয়ার পর আমরা অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন এসে পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, রোগী পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া, এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজনেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন নৌকায় পারাপারে বাড়তি খরচের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। বর্ষাকালে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের পারাপার আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অনেকেই প্রয়োজন না থাকলে বাড়ির বাইরে যেতে সাহস করেন না।
কৃষকরাও বিপাকে পড়েছেন। তারা জানান, উৎপাদিত ফসল, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করা হলেও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ার পর প্রকৌশলী দিয়ে পরিদর্শন করানো হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে এটি আর মেরামতযোগ্য নয়। সেখানে কীভাবে একটি টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।
হোসাইন সুলভ/কেএইচকে/জেআইএম








