কয়লাভিত্তিক একটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র বাঁচাতে সরকারকে বছরে ৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হবে। আলোচ্য কোম্পানির নাম এসএস পাওয়ার। অবস্থান চট্টগ্রামের বাঁশখালী। যার মূল মালিক এস আলম গ্রুপ। অভিযোগ উঠেছে, কুতুবদিয়া থেকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূরত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও লাইটার জাহাজের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ নির্ধারণ করা আছে। এই কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ নতুন করে কয়লা এবং আন্তর্জাতিক পরিবহণ খরচ রিভিউ করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেক্ষেত্রে লাইটার জাহাজের বাড়তি চার্জ কেন আগের মতো বহাল রাখা হবে, সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্র বলছে, লাইটার জাহাজের বিদ্যমান ভাড়া যদি আবারও বহাল রাখা হয়, তাহলে প্রতিবছর সরকারকে অতিরিক্ত বিল দিতে হবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এ চুক্তি বহাল থাকবে ২০৪৮ সাল পর্যন্ত। এ হিসাবে সরকারকে আগামী ২২ বছরে মোট অতিরিক্ত ভুর্তকি গুনতে হবে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। অথচ এভাবে অর্থ অপচয়ের পথ খোলা রেখে ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মহলবিশেষ সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে শুভংকরের এই ফাঁকি গোপন রেখে প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে ক্রয় কমিটি পর্যন্ত অনুমোদন করাতে চায়।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ যুগান্তরের কাছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এসএস পাওয়ারকে এ ধরনের কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক কয়লা ব্যবহার হয় ১০ হাজার টন। ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা কয়লা এই কেন্দ্রে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ-চীন বিদ্যুৎকেন্দ্র কখনো কখনো ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা লাইটারেজ জাহাজ দিয়ে কুতুবদিয়া থেকে পায়রা পর্যন্ত নিয়ে যায়। চুক্তি অনুযায়ী তখন তারা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির কাছ থেকে বিল পায় প্রতি টনে ৯ ডলার। কিন্তু এর চেয়ে অনেক কম দূরত্ব কুতুবদিয়া থেকে বাঁশখালী। এই কম দূরত্বে লাইটারেজ জাহাজের জন্য প্রতি টনে পিডিবি বিল দেয় ১৬ দশমিক ৪৬ ডলার। এই ভাড়া আদায়ের সুবিধা দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ সালে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (পিপিএ) করা হয়। এ কারণে এই বাড়তি লাইটার জাহাজ ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বারবার তাগিদ দিয়েও রহস্যজনক কারণে সেটি তারা কার্যকর করতে পারেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে বলেন, অর্থ অপচয় বা ঘুরিয়ে দুর্নীতির অর্থ ভাগাভাগির সুযোগ দিয়ে এ ধরনের বিতর্কিত চুক্তি করে তৎকালীন সরকার। মূলত উদ্দেশ্য ছিল বাড়তি অর্থ ‘ড্রেন আউট’ করে প্রভাবশালীদের পকেটে নিয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ বিভাগের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। কিন্তু কেউ এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।
অনেকে অভিযোগ করেন, এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। কিন্তু ভেতরের এই বড় ফাঁকফোকর গোপন করে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন করা হয়েছে। বিষয়গুলো সচিব, বিদ্যুৎমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিসভার সদস্যদের জানানো হয়নি। এখন ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন করা হলে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদে বিপুল অঙ্কের খেসারত দিতে হবে। এজন্য তারা মনে করেন, জরুরি ভিত্তিতে পুরো বিষয়টি নিয়ে একটি কারিগরি তদন্ত কমিটি করা দরকার।
তারা বলেন, এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে জানানো হলে কয়লার দাম এবং আন্তর্জাতিক রুটে পরিবহণ ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি লাইটারেজের চার্জও সমন্বয় করা যেত। সেটি করা হলে নতুন করে এই প্রশ্ন সামনে আসত না।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, এসএস পাওয়ারের অনুমোদনে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এস আলম গ্রুপ ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ও বরিশালে যথাক্রমে ৬১২ ও ২৭৬ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ পায়। কিন্তু পরে তারা বরিশালের কেন্দ্রটিও ৬১২ মেগাওয়াটে উন্নীত করে। এখানেই শেষ নয়, এরপর তারা চট্টগ্রাম ও বরিশালের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি একীভূত করে এবং শেষমেষ তারা আরও কিছুটা বাড়িয়ে ১৩২০ মেগাওয়াটে উন্নীত করে। অনেকে মনে করেন, সরকারের প্রভাবশালী মহলের সবুজ সংকেত ছাড়া দরপত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত লঙ্ঘন করে এভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব ছিল না।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর এস আলমের কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াটের এসএস পাওয়ার কেন্দ্রটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি।








