পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম ‘নবীন’। শব্দটির অর্থ তরুণ বা আধুনিক হলেও এই গ্রামে আধুনিকতার ছিটেফোঁটাও নেই। চলনবিল বেষ্টিত গ্রামের চারদিকে ধু-ধু বিল। যেন শত বছর পিছিয়ে থাকা এক জনপদ। বর্ষাকালে চারদিকে থইথই পানি, শুকনো মৌসুমে কাদামাটির হাঁটাপথ। কংক্রিটের রাস্তা নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই, নেই কোনো যানবাহন। পুরো গ্রামে ভরসা একটি মাত্র ঘোড়ার গাড়ি। যাতায়াতের বেহালদশার কারণে এই গ্রামে কেউ বিয়ে দিতে চায় না।

সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল জলরাশির মাঝে এক খণ্ড দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে নবীন গ্রাম। গ্রামের মাঝখানে ‘ভায়রা বাজার’ নামে একটি বাজার আছে। সেখানে তিনটি চায়ের দোকান ছাড়া আর কিছুই নেই। সবজি বা মুদিখানার বাজার করতে বর্ষাকালে নৌকায় ছাইকোলা বা হান্ডিয়াল বাজারে যান এলাকার মানুষ। গ্রামে একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; যেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৪ সালে। শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে হয় নৌকায় অথবা কাদাপথ হেঁটে।

গ্রামবাসী জানান, কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎ পৌঁছলেও এখানে কোনো স্বাস্থ্যসেবা নেই। কেউ অসুস্থ হলে নৌকায় করে রোগীকে প্রথমে ছাইকোলা বা হান্ডিয়াল বাজারে নিতে হয়। সেখান থেকে প্রায় ১৫-১৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। গ্রামে বিগত দিনে বেশ কয়েকজন প্রসূতি মা ও সদ্যজাত শিশু শুধু চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে।

গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বেহাল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। ফড়িয়ারা গ্রামে গিয়ে নামমাত্র মূল্যে কৃষকের মূল্যবান ফসল কিনে নিয়ে যায়।

হাশেম আলী নামে গ্রামের এক কৃষক যুগান্তরকে বলেন, বর্ষকালে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে বিলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। ভোটের সময় কিছু নেতা এসে বলে, ভোটে জিতলে সব করে দেব। কিন্তু ভোট ফুরালে তাদের আর দেখা যায় না। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় সবচেয়ে বেশি ফসল ফলে। কিন্তু পরিবহণব্যবস্থা না থাকায় আমরা শহরে নিতে পারি না। যে কারণে গ্রামে বসেই খুব অল্প দামে ফসল বিক্রি করতে হয়।

বাসিন্দা ইনতাজ প্রামাণিক বলেন, আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি আমাদের গ্রামে। কেউ কনে দেখতে এলে গ্রামের অবস্থা দেখেই ফিরে যায়। কেউ বিয়ে দিতে চায় না। তিনি বলেন, গ্রামের প্রায় ৪ শতাধিক পরিবারের ভরসা একটি মাত্র ঘোড়ার গাড়ি। একটি সাবমারসিবল রোড (কংক্রিটের সড়ক) আর একটি সেতু পারে আমাদের কষ্ট দূর করতে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুসা নাসের চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, নবীন গ্রামের মানুষ সত্যিই খুব কষ্টে জীবনযাপন করে। কীভাবে তাদের কষ্ট কমানো যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দুর্ভোগ দূর হবে।