কৌশলের বোর্ডে যখন দুই ভিন্ন দর্শনের মহাসমর ঘটে, তখন ফুটবল ম্যাচ আর স্রেফ খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদিকে এশিয়ার সবচেয়ে সুশৃঙ্খল, গতিময় এবং হাই-প্রেসিং ফুটবলের ধারক ‘ব্লু সামুরাই’ তথা জাপান। অন্যদিকে, নান্দনিক সাম্বা জাদুর দেশ ব্রাজিল। তবে এই লড়াইয়ের আড়ালে আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে ডাগআউটে। জাপানের হাই-প্রেস এবং হাই ডিফেন্স লাইনকে গুঁড়িয়ে দিতে সেলেসাওদের মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি পর্দার আড়ালে কী নিখুঁত পরিকল্পনা ফাঁদছেন, তা নিয়েই জমে উঠেছে মাঠের বাইরের উত্তেজনা।
নেইমার আতঙ্ক ও আনচেলত্তির চাল ব্রাজিল নামটা শুনলেই প্রতিপক্ষের মনে প্রথম কোন ছবিটা ভেসে ওঠে? জাপানি ফরোয়ার্ড কেন্টো শিওগাইয়ের মুখে অবশ্য এক শব্দে উত্তর এসেছে, ‘নেইমার’। তবে পরক্ষণেই কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি যোগ করেন যে, ওটা তো পুরোনো নেইমার ছিল। এখন আর সেই ধার নেই এবং জাপান বর্তমানে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। শিওগাই সংবাদ সম্মেলনে যতই আত্মবিশ্বাসের চাদর গায়ে জড়ান না কেন, নেইমার নামটা যে যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য কতটা ভীতিজাগানিয়া, তা জাপানি শিবিরে অজানা থাকার কথা নয়।
জাপানের বিপক্ষে এই সেলেসাও তারকা ঠিক কতক্ষণ মাঠে থাকবেন, তা নিশ্চিত না হলেও আনচেলত্তির আক্রমণভাগের মূল চাবিকাঠি যে তিনিই হতে যাচ্ছেন, তা স্পষ্ট। এই ম্যাচে নেইমারের অবিশ্বাস্য ‘প্রেস রেজিস্ট্যান্স’ ক্ষমতা আর নিখুঁত থ্রু-বলের দিকেই তাকিয়ে থাকবে দল। জাপানের প্রেসিং ট্র্যাপ ফাঁকি দিয়ে বল বের করে আনাটাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আর এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আনচেলত্তি নেইমারকে মাঠে কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় বন্দি না রেখে সম্পূর্ণ ‘ফ্রি রোল’ বা মুক্ত ভূমিকা দিতে যাচ্ছেন। তিনি উইং ছেড়ে খেলবেন প্রথাগত ‘নাম্বার ১০’ বা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার পজিশনে, যেখান থেকে পুরো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জাপানের আক্রমণাত্মক ফাঁদ এবং আনচেলত্তির পাল্টা চাল জাপান এই ম্যাচে মাঠে নামবে অল-আউট আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়ে। বলের দখল দীর্ঘ সময় নিজেদের পায়ে রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অধিনে রাখাই মোরিয়াসুর মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে দুই প্রান্ত দিয়ে উইং-ব্যাক জুনিয়া ইতো এবং উইঙ্গার থেকে উইং-ব্যাকের ভূমিকায় আসা কাওরু মিটোমারা যখন ঝড়ের গতিতে ওপরে উঠে আসবেন, তখন ব্রাজিলের রক্ষণভাগে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।
কিন্তু এই অতি-আক্রমণাত্মক মেজাজই আনচেলত্তির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। জাপানের উইং-ব্যাকরা যখনই আক্রমণের নেশায় ওপরে উঠে যাবেন, তখনই তাদের হাই ডিফেন্স লাইনের পেছনে এক বিশাল ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে। চতুর ইতালিয়ান কোচ আনচেলত্তি ঠিক এই দুর্বলতাটুকুই লুফে নেওয়ার জন্য ওত পেতে আছেন।
লো ব্লকের ফাঁদ ও কাউন্টার অ্যাটাকের রণকৌশল জাপানের এই গতিময় আক্রমণের জবাব দিতে আনচেলত্তি শুরুতেই কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পাসিং গেমে যাবেন না। বরং তিনি বেছে নেবেন বাস্তবসম্মত প্র্যাগমেটিক ফুটবল। দলকে কিছুটা নিচে নামিয়ে তিনি তৈরি করবেন এক দুর্ভেদ্য ‘লো-টু-মিডিয়াম ব্লক’।
এটি আসলে জাপানকে প্রলুব্ধ করার একটি সুক্ষ্ম কৌশল। আনচেলত্তি ইচ্ছে করেই জাপানকে বলের দখল ছেড়ে দিয়ে ওপরে উঠে আসার আমন্ত্রণ জানাবেন। ব্লু সামুরাইরা যত ওপরে উঠে আসবে, ব্রাজিলের কাউন্টার অ্যাটাকের অস্ত্রগুলো তত বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে রায়ান যেভাবে ডান প্রান্ত ধরে প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিয়েছিলেন, তাতে আর্সেনালের জাপানি ডিফেন্ডার তাকেহিরো তোমিয়াসুর জন্য আনচেলত্তির এই লো ব্লকের ফাঁদ সামলানো এক বিরাট পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র জাপানের এই হাই ডিফেন্স লাইনকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার জন্য আনচেলত্তির তূণীরের সবচেয়ে ধারালো তির হলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মাঠের একপাশে পরিকল্পিতভাবে খেলোয়াড়দের জটলা তৈরি করে জাপানি ডিফেন্ডারদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হবে। আর ঠিক তখনই আকস্মিক এক লং ডায়াগনাল পাসে বল পাঠিয়ে দেওয়া হবে অপর প্রান্তে থাকা ভিনির পায়ে। ভিনিসিয়ুসকে দিয়ে ‘ওভারলোড টু আইসোলেট’ করার এই কৌশলের কাছেই হয়তো পরাস্ত হতে পারে কো ইতাকুরা কিংবা শোগো তানিলুচিদের গতি।
একদিকে তোমিয়াসু ও ইতাকুরাদের নিয়ে গড়া জাপানের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স এবং হাই-প্রেসিং পজিশনাল ফুটবল, অন্যদিকে কার্লো আনচেলত্তির মরণফাঁদ, নেইমারের সৃষ্টিশীলতা এবং ভিনিসিয়ুসের অতিমানবীয় কাউন্টার অ্যাটাক। কৌশলের এই চরম মহাযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে কে? আনচেলত্তির মাস্টারপ্ল্যান কি জাপানি ডিফেন্সকে স্তব্ধ করে দেবে, নাকি ব্লু সামুরাইদের নিখুঁত ডিসিপ্লিনের কাছে চূর্ণ হবে সেলেসাওদের দম্ভ? উত্তর মিলবে কেবলই সবুজ গালিচায়।








