আজ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার চলে গেলেন। একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও সমাজবিশ্লেষকের বিদায়ে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে তৈরি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
স্যারের সঙ্গে আমার দীর্ঘ পরিচয় ছিল না। তার ছাত্রও ছিলাম না। ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি স্মৃতিও নেই। কিন্তু অল্প কিছু মুহূর্তও কখনো কখনো মানুষের ছোট জীবনকে ছুঁয়ে যায়। আমার কাছে স্যারকে মনে রাখার মতো এমনই একটি ঘটনা আছে, যা আজ তার মৃত্যুর দিনে আরও গভীরভাবে মনে পড়ছে।
সম্ভবত করোনা পরবর্তী সময়। তখন আমি একটি জাতীয় দৈনিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করি। একদিন ছুটির দিনে, শুক্রবার কিংবা শনিবার। অফিস থেকে একটি অনুষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হলো। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
আরও পড়ুন
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মারা গেছেন
আমি যথেষ্ট আগেই বের হয়েছিলাম। পরিকল্পনা ছিল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই পৌঁছে যাব। কিন্তু সেদিনের তীব্র যানজট সব পরিকল্পনা এলোমেলো করে দিলো। যখন অনুষ্ঠানে পৌঁছালাম, তখন স্যারের মূল বক্তব্য শেষ। দ্বিতীয় পর্বের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল।
সহকর্মীদের কাছ থেকেও স্যারের বক্তব্য পুরোপুরি সংগ্রহ করতে পারছিলাম না। কী করবো বুঝে উঠতে না পেরে চুপচাপ বসে রইলাম।
একসময় সুযোগ পেয়ে সরাসরি স্যারের কাছে গেলাম। নিজের পরিচয় দিলাম। বললাম, আমি সংবাদ সংগ্রহ করতে এসেছিলাম, কিন্তু যানজটের কারণে দেরি হয়ে গেছে। যদি একটু সাহায্য করতেন...
আমি ভেবেছিলাম, হয়তো তিনি দু-এক মিনিট সময় দিয়ে মৌখিকভাবে কিছু কথা বলবেন। কিন্তু তিনি যা করলেন, তা আজও আমাকে বিস্মিত করে।
আরও পড়ুন
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে শোকাহত কবি-লেখকেরা
তিনি আমাকে বসতে বললেন। তারপর নিজের সামনে থাকা কাগজ-কলম তুলে নিয়ে ধীরস্থিরভাবে লিখতে শুরু করলেন। চারপাশে অনুষ্ঠান চলছে, মানুষজন তার সঙ্গে কথা বলতে আসছেন, নানা ব্যস্ততা। তবু তিনি মনোযোগ দিয়ে কয়েক মিনিট ধরে লিখলেন।
লেখা শেষ করে কাগজটি আমার হাতে দিয়ে শুধু বললেন, ‘এটা রাখো।’
আমি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ছিলাম। তখন আমি পেশাগত জীবনের একেবারে শুরুর দিকে। এমন অভিজ্ঞতা ছিল না। দেশের অন্যতম একজন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, যার লেখা ও বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে আমাদের পত্রিকায় প্রকাশিত হতো, তিনি একজন প্রতিবেদকের অসুবিধাকে নিজের বিষয় বলে মনে করলেন। ব্যস্ততার মধ্যেও বিরক্ত হলেন না, দায় এড়িয়ে গেলেন না; নিজের হাতে বক্তব্য লিখে দিলেন, যাতে আমার প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ না থাকে।
সেদিন আমি শুধু একটি বক্তব্য নিয়ে ফিরিনি; সঙ্গে করে নিয়ে ফিরেছিলাম একজন প্রকৃত শিক্ষকের বিনয়, দায়িত্ববোধ এবং মানুষকে সম্মান করার অসাধারণ শিক্ষা।
পরে আরও কয়েকটি অনুষ্ঠানে তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রতিবারই একটি বিষয় আমাকে মুগ্ধ করতো। তার বক্তব্যে কখনো অযথা জটিলতা থাকতো না। গভীর দর্শন, ইতিহাস, রাষ্ট্রচিন্তা কিংবা সমাজ বিশ্লেষণের মতো কঠিন বিষয়ও তিনি এমন সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন, যেন একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে বসে আপনজনের মতো বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তিনি শুধু বক্তব্য দিতেন না, শ্রোতাদের ভাবনার অংশীদার করে নিতেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক, লেখক, গবেষক, ঐতিহাসিক, অনুবাদক, সাহিত্যসমালোচক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। নিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তা, স্বদেশভাবনা, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে তার বিশ্লেষণ তাকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার রচনা ও চিন্তা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলো ছড়াবে।
আরও পড়ুন
বাংলা একাডেমির শোকবার্তা / ‘অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক অসামান্য অবদান রেখেছেন’
মানুষের জীবন সীমিত। একদিন সবাইকেই চলে যেতে হয়। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের জ্ঞান, কর্ম, চিন্তা, মানবিকতা এবং আচরণের মাধ্যমে সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তাদেরই একজন।
আজ তার মৃত্যুর সংবাদে সেই ছোট্ট ঘটনাটিই বারবার মনে পড়ছে। একটি কাগজ, কয়েকটি হাতে লেখা বাক্য, আর একজন অল্প বয়সী সাংবাদিকের প্রতি তার আন্তরিকতা, আমার কাছে এটাই তার মহত্ত্বের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।
স্যার, আপনার লেখা, আপনার চিন্তা এবং আপনার মানবিক আচরণ আমার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। একজন আলোকিত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
এমডিএএ/এমএমকে








