ইউক্রেন যুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সেনা হতাহতের ক্ষতি পূরণে এবার বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগে জোর দিচ্ছে রাশিয়া। বিশেষ করে ড্রোন ইউনিটে যোগ দেওয়ার জন্য তরুণদের আকৃষ্ট করতে দেশজুড়ে নতুন নিয়োগ কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, তুলনামূলক নিরাপদ এবং উচ্চ বেতনের সামরিক পেশার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে প্রশিক্ষণ শেষে অনেককেই সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২৩ বছর বয়সী ভ্যালেরি অ্যাভেরিন ছিলেন এমনই একজন শিক্ষার্থী। সাইবেরিয়ার একটি অনাথ আশ্রমে বেড়ে ওঠা অ্যাভেরিন নির্মাণ প্রযুক্তি বিষয়ে শেষ বর্ষে পড়ার সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিন মাস ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও তাকে সম্মুখসারির যুদ্ধে পাঠানো হয়।

তার পালক মা ওকসানা আফানাসিয়েভা বলেন, সে কখনো সেনাবাহিনীতে চাকরিও করেনি। তাকে বলা হয়েছিল কিছু হবে না, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই মর্টার হামলায় তার মৃত্যু হয়।

একই ধরনের পরিণতি হয়েছে ১৮ বছর বয়সী ভ্লাদিস্লাভ গরবুনভ ও রাখিম আবদুলিনের। ড্রোন অপারেটর হওয়ার আশায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও দুজনই কয়েক মাসের মধ্যে যুদ্ধে নিহত হন।

আবদুলিনের মা এলেনা বলেন, ও ভেবেছিল ড্রোন ইউনিট নিরাপদ হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝেছে, সেটাও মোটেই নিরাপদ নয়।

হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে

বিবিসির বিশ্লেষণে কবরস্থান, যুদ্ধস্মারক, সরকারি নথি ও শোকবার্তার তথ্য যাচাই করে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার অন্তত ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৭ সেনাসদস্যের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রকৃত সংখ্যার মাত্র ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ। সেই হিসাবে রাশিয়ার প্রকৃত সামরিক মৃত্যুর সংখ্যা ৪ লাখ ১৭ হাজার থেকে ৫ লাখ ৯ হাজারের মধ্যে হতে পারে। যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউও মে মাসে প্রায় পাঁচ লাখ রুশ সেনার মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল।

ইউক্রেনও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫৫ হাজার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করেন। এছাড়া বিপুলসংখ্যক সেনা এখনও নিখোঁজ।

শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রস্তাব

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের জন্য এক বছরের বিশেষ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব দিচ্ছে। এতে ড্রোন ইউনিটে কাজের পাশাপাশি উচ্চ বেতন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন এবং পরে আবার পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এককালীন অর্থসহায়তা, আবাসন সুবিধা, উচ্চশিক্ষায় অগ্রাধিকার এবং সরকারি অর্থায়নে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।

মস্কোয় বিতরণ করা লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম বছরেই একজন স্বেচ্ছাসেবক অন্তত ৫০ লাখ রুবল আয় করতে পারেন।

বাস্তবতা ভিন্ন, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

তবে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

২০২২ সালে আংশিক সামরিক সমাবেশ ঘোষণার পর রাশিয়ায় সামরিক চুক্তিগুলো কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল থাকে। ফলে এক বছরের চুক্তি শেষ হলেও অধিকাংশ সেনা আর বাহিনী ছাড়তে পারেন না।

এ ছাড়া ড্রোন অপারেটরদেরও এখন যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৯২০ জন রুশ ড্রোন অপারেটর নিহত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চাপ দিয়েও নিয়োগের অভিযোগ

বিবিসির অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্বল ফল করা বা বহিষ্কারের ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহ কিংবা চাপ দেওয়া হচ্ছে।

কিছু প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থী সেনাবাহিনীতে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি দেখাচ্ছে যে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সেনাবাহিনীতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তা গভীরভাবে পৌঁছে গেছে। তরুণদের অর্থ, দক্ষতা ও স্বল্পমেয়াদি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধে টানা হলেও, অনেকের জন্য সেই প্রতিশ্রুতি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম