মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক নতুন ও বড় ধরণের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তুরস্ক ও ইসরায়েল। বছরের পর বছর ধরে চলা দুই দেশের হুমকি ও পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে আরও তীব্র ও তিক্ত হয়ে ওঠে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
পরিস্থিতি এখন এতটাই জটিল যে, এখন ইসরায়েলি রাজনীতিকরা ইরানের সঙ্গে একই সমান্তরালে তুরস্কের নাম নিচ্ছেন। খোদ ইসরায়েলের এক মন্ত্রী দাবি করেছেন যে, সিরিয়ার পাশাপাশি তুরস্কই এখন ইরানের জায়গা নিয়ে তাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েল গত ২৮ জুন অটোমানদের দ্বারা ১৯১৫ সালে সংঘটিত আর্মেনীয় গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে এই উত্তেজনাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে (তুরস্ক অবশ্য এই মৃত্যুকে যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যা কোনোটিই মনে করে না)। অন্যদিকে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানও গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছেন।
সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন যে, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ তুরস্কের জন্য বড় হুমকি। এমনকি গত জুনের শুরুতে তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, জেরুজালেম তুর্কি নিয়ন্ত্রণে এলে তিনি সেখানকার গভর্নর হতে চান। উল্লেখ্য, ১৯১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার শতাব্দী ধরে অটোমান সাম্রাজ্য জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন শাসন করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাগযুদ্ধের বড় অংশই মূলত নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ দর্শকদের মন জয়ের চেষ্টা (পোস্টারিং)। আগামী অক্টোবরে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ভোটারদের কাছে নিজেকে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে চান, যিনি অবরুদ্ধ ইসরায়েলকে রক্ষা করতে পারেন। অন্যদিকে, ২০২৮ সালের নির্ধারিত নির্বাচন এগিয়ে আনার কথা ভাবতে থাকা এরদোয়ানেরও দেশের ৩০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার থেকে জনগণের নজর ঘুরিয়ে রাখতে একটি ‘বোগিম্যান’ বা জুজু দরকার।
তবে এই প্রচারণার আড়ালে দুই দেশের মধ্যেই একে অন্যকে নিয়ে গভীর ভয় কাজ করছে। ইসরায়েল মূলত সিরিয়ায় তুরস্কের বিশাল সামরিক উপস্থিতি এবং মিশর, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে আঙ্কারার গড়ে ওঠা সামরিক জোটকে সন্দেহের চোখে দেখছে। অন্যদিকে, তুরস্কের ভয়—গাজা, ইরান ও লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ ও কুর্দি বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের থিংক-ট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর আসলি আয়দিনতাসবাস বলেন, তুর্কি নীতিনির্ধারকরা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি ফাইলে বা বিষয়েই ইসরায়েলকে একটি বড় বাধা বলে মনে করেন। আপাতত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি কম হলেও, একে আর একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পারিপার্শ্বিক দ্বন্দ্ব: ইরান, কুর্দি ও ভূমধ্যসাগর ইস্যু
ইরানে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ তুরস্কের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক দীর্ঘকাল ধরে ইরানে যে কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে; কারণ তারা ভয় পায়, ইরানের পতন হলে সীমান্তে নতুন শরণার্থী সংকট তৈরি হবে এবং বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহ ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে তারা চিন্তিত যে, তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা (যার সঙ্গে তুরস্কের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে) যদি কোনো ইসরায়েল-বান্ধব সরকার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তবে তা আঙ্কারার জন্য বিপজ্জনক হবে।
এছাড়া সিরিয়া, ইরান ও ইরাকে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইসরায়েলের সমর্থন তুরস্ককে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। কুর্দি যোদ্ধাদের এই যুদ্ধে জড়ানোর মার্কিন ও ইসরায়েলি পরিকল্পনা তুরস্কের সেই চরম ভয়কেই সত্যি করেছিল। তবে এরদোয়ানের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনা স্থগিত (শেলভ) করতে বাধ্য হন বলে জানা যায়।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের প্রভাব খর্ব করতে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আঙ্কারাকে আরও চটিয়েছে। এই তিন দেশ নৌ ও বিমান মহড়া বাড়িয়েছে এবং সমুদ্রের জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষার পরিকল্পনা করছে। ইসরায়েল এরই মধ্যে গ্রিসকে প্রিসিশন রকেট আর্টিলারি ও সাইপ্রাসকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। জবাবে তুরস্কও ভূমধ্যসাগরের বিতর্কিত জলসীমা ও তলদেশের গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নিজেদের দাবি দ্বিগুণ জোরদার করেছে।
সিরিয়া পরিস্থিতি ও ট্রাম্পের ভূমিকা
ইসরায়েল দীর্ঘ দিন ধরেই ৭ অক্টোবরের হামলার নেপথ্যে থাকা হামাসকে তুরস্কের সমর্থনের কারণে ক্ষুব্ধ। তবে সম্প্রতি তারা সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে বেশি চিন্তিত। আহমেদ আল-শারা’র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেছে, যা দীর্ঘ যুদ্ধে এমনিতেই বিধ্বস্ত। শারা’র এই দুর্বল সরকার তার আগ্রাসী প্রতিবেশী ইসরায়েলকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও, অনেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা সিরিয়াকে একটি ‘টিকিং টাইম-বম’ বা টাইম-বোমা মনে করেন। তাদের বিশ্বাস, আল-কায়েদার সাবেক কমান্ডার শারা’র এই নতুন সরকারের ওপর তুর্কি নেতাদের অতিরিক্ত ও অন্যায্য প্রভাব রয়েছে।
২০২৫ সাল থেকে সিরিয়া নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা কিছুটা কমলেও সংঘাতের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। সিরিয়ায় দুই দেশেরই নিজস্ব প্রভাব বলয় রয়েছে- উত্তরে তুর্কি সেনা ও দক্ষিণে ইসরায়েলি সেনা অবস্থান করছে। তবে তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত; তুরস্ক সিরিয়াকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, আর ইসরায়েল চায় দুর্বল সিরিয়া।
ইসরায়েল এরই মধ্যে সিরিয়ার শত শত সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো মূলত তুরস্কের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। তবে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত যোগাযোগের কারণে সেনারা এখনো সরাসরি মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত রয়েছে।
ইরান যুদ্ধ অবশ্য বৈশ্বিক রাজনীতিতে তুরস্কের হাতকে শক্তিশালী করেছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুরস্ক নিজের অবস্থান পাকা করেছে, ন্যাটোতে নিজের মর্যাদা বাড়িয়েছে ও ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইরান বা ইসরায়েলের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় তুরস্ক বিশেষ করে মিশর, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি করার আলোচনা গত এক বছরে বেশ গতিশীল করেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ইরানে নিজের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা (ব্রোম্যান্স) ও সিরিয়াসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য স্থানে তুরস্কের সঙ্গে কাজ করার মার্কিন প্রস্তুতিকে নেতানিয়াহু ভালোভাবে নিচ্ছেন না। ট্রাম্পের বারবার দেওয়া এই পরামর্শ- যে সিরিয়া সরকারের উচিত হিজবুল্লাহর মুখোমুখি হওয়া, তা মূলত সিরিয়ার অভিভাবক তুরস্ককে পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার সামিল বলে মনে করছে ইসরায়েল।
নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠরা জানান, ট্রাম্প যখন আসাদ সরকারের পতনের কৃতিত্ব তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে দেন, তখন নেতানিয়াহু সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হন। নেতানিয়াহুর দাবি, হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের প্রচণ্ড আঘাতই সিরিয়ার বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল।
এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান নিয়ে নতুন লড়াই
ইসরায়েলকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে এক দশক আগে তুরস্কের অর্ডার করা ‘এফ-৩৫’ স্টিলথ ফাইটার জেট ফিরে পাওয়ার নতুন তুর্কি প্রচেষ্টা। মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র ইসরায়েলের কাছেই এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। ২০১৯ সালে তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করেছিল। তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। গত ২৪ জুন ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি পর্যালোচনা করছে ও এরদোয়ানের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি সম্ভবত এমন কিছু করতে যাচ্ছি যা তাকে খুব খুশি করবে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সোনার চাগাপতাই বলেন, এই এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কারণেই ইসরায়েল এখন তুরস্কের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ও নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য মূলত মার্কিন কংগ্রেসকে প্রভাবিত করা। ইসরায়েলিরা জানে যে ট্রাম্প তুরস্ককে এফ-৩৫ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ও তারা এটিকে শুরুতেই রুখে দিতে চায়।
সম্পর্ক কি পুরোপুরি শেষ?
এত উত্তেজনার পরও দুই দেশ কিন্তু একে অপরের সঙ্গে সব সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ করে দেয়নি। তেল আবিব ও আঙ্কারায় দুই দেশের দূতাবাস এখনো সচল রয়েছে, যদিও ২০২৩ সালে তারা রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। দুই বছর আগে এরদোয়ানের ঘোষিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অন্যান্য দেশ বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তুর্কি পণ্য ঠিকই ইসরায়েলে পৌঁছাচ্ছে। এমনকি, আজারবাইজান ও উত্তর ইরাকের তেল এখনো তুরস্কের ‘চেয়হান’ বন্দরের মাধ্যমেই ইসরায়েলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অনেকে মনে করেন, নেতানিয়াহু ও এরদোয়ানের যুগের অবসান ঘটলে দুই দেশ আবার পুরোনো বিরোধ ভুলে কাছাকাছি আসতে পারে। কারণ, আরবের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি পশ্চিমা-ঘেঁষা শক্তি হিসেবে তাদের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে তুরস্কই ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে মূল্যবান আঞ্চলিক অংশীদার।
তবে এই শঙ্কা ও অবিশ্বাস বর্তমান নেতাদের ছাড়িয়ে আরও গভীরে প্রোথিত। ইসরায়েল মনে করে তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হাকান ফিদান (যিনি এরদোয়ানের উত্তরসূরি হতে পারেন) একজন কট্টর ইসরায়েল-বিরোধী মানুষ ও ইরানের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
একজন ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষক তাকে ‘এই অঞ্চলে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের মিত্র ইসরায়েল ও ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর তুরস্কের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ লাগার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলো প্রমাণ করেছে যে একসময় যা ভাবা অসম্ভব ছিল, তা-ও বাস্তবে সম্ভব হতে পারে। আর তাই এই দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ বাজি এখন অনেক উঁচুতে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
এসএএইচ








