কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানিয়েছেন ভ্যাটিকানের পোপ লিও চতুর্দশ। এর মাধ্যমে তিনি মূলত পরোক্ষভাবে চীনা কমিউনিস্ট এজেন্টের মতো কাজ করছেন বলে দাবি করেছেন মার্কিন বিলিয়নিয়ার পিটার থিয়েল। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে আয়োজিত ‘অ্যাসপেন আইডিয়াজ ফেস্টিভ্যাল’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টিতে উগ্র বামপন্থী বা ডেমোক্রেটিক-সোশ্যালিস্টদের আধিপত্য বিস্তার এবং ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে একাধিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।

পেপ্যাল ও প্যালান্টিরের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দিকের সমর্থকদের মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া বর্তমান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ক্যারিয়ার গঠনেও থিয়েলের বড় অবদান রয়েছে। অ্যাসপেন ফেস্টিভ্যালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার সঙ্গে ‘হিউম্যানিটি অ্যাট দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে থিয়েল পোপের সমালোচনা করেন।

উল্লেখ্য, গত মে মাসে পোপ লিও চতুর্দশ তাঁর প্রথম এনসাইক্লিক্যাল (ম্যাগনিফিকা হিউম্যানিটাস) নামের নথিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি ‘অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি এটিকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার এবং এর ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপেরও আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে থিয়েল যুক্তি দেখান, পোপের এই ধর্মীয় ও নৈতিক বার্তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশগুলো এআইয়ের বিকাশ ধীর করে দেবে। কিন্তু চীন কোনোভাবেই পোপের কথায় কান দেবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বর্তমান তীব্র এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় শুধু এক পক্ষ তথা যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে।

এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই থিয়েল দাবি করেন, পোপ প্রকৃতপক্ষে চীনা কমিউনিস্টদের হয়ে কাজ করছেন। থিয়েলের এই মন্তব্য শুনে উপস্থিত দর্শকেরা হেসে ওঠেন। তবে ভ্যাটিকান এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

ফুকুইয়ামার সঙ্গে দীর্ঘ ১৪ বছর পর আয়োজিত এই প্যানেল আলোচনায় থিয়েল পশ্চিমা গণতন্ত্রের বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরম স্থবিরতার ইঞ্জিন হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, প্রযুক্তির স্থবিরতাই আজ পশ্চিমা রাজনীতিকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আলোচনায় মার্কিন রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে থিয়েল দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন চরম বামপন্থী শক্তির উত্থান ঘটছে। শিগগির ডেমোক্রেটিক পার্টির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ডেমোক্রেটিক-সোশ্যালিস্টদের হাতে চলে যাবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি গত বছর নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে জোহরান মামদানির জয় এবং চলতি বছরে একাধিক মেয়র ও কংগ্রেসের প্রাথমিক নির্বাচনে (প্রাইমারি) সোশ্যালিস্ট প্রার্থীদের একচেটিয়া বিজয়ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘রিপাবলিকান পার্টি আসলে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, ডেমোক্রেটিক পার্টি যখন সম্পূর্ণভাবে সোশ্যালিস্টদের দখলে চলে যাবে, তখনই এই দেশের পতন নিশ্চিত হবে।’

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে মার্কিন সংবিধানের ভিন্ন এক ব্যাখ্যা দাঁড় করান থিয়েল। তিনি বলেন, আমেরিকান বিপ্লব আসলে রাজা জর্জের বিরুদ্ধে ছিল না। বিপ্লব ছিল আসলে ব্রিটেনের স্বৈরাচারী ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী পার্লামেন্ট এবং আইনজীবীদের শাসনের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ। এ ছাড়া তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) একটি স্থবির ও নিয়মকানুনের বেড়াজালে বন্দী আমলাতন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, পেন্টাগন এবং ইমিগ্রেশন বিভাগের সঙ্গে প্যালান্টিরের বিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে। থিয়েল দাবি করেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও তাঁর কোম্পানি মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া সরকারের অংশ নয়। আমেরিকার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বিশাল ক্ষমতাকে তিনি দেশের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরেন।

২০২৮ সালের মার্কিন নির্বাচন নিয়ে থিয়েল বলেন, শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক একটি উগ্র উদারপন্থী কোম্পানি। তারা তাদের অত্যাধুনিক এআই মডেল ব্যবহার করে ২০২৮ সালের মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জেতাতে ব্যাপক কারচুপি বা জালিয়াতি করবে।

থিয়েলের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মাধ্যমে ইলন মাস্ক ডানপন্থীদের পক্ষে যত চেষ্টাই করুন না কেন, অ্যানথ্রোপিকের এআই তার চেয়ে অনেক বেশি চতুরতার সঙ্গে কাজ করবে। অ্যানথ্রোপিক অবশ্য থিয়েলের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

বক্তব্যের শেষে নিজের প্যালান্টির কোম্পানির নামকরণ প্রসঙ্গে সমালোচকদের জবাব দেন থিয়েল। তিনি জানান, প্যালান্টির নামটি জে.আর.আর. টলকিনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’-এর জাদুকরি পাথর ‘প্যালান্টির’ থেকে নেওয়া হয়েছে। সমালোচকেরা বলে থাকেন, যারা এই পাথর ব্যবহার করে তারা শেষ পর্যন্ত ভিলেন সাউরনের প্রভাবে পড়ে।

তবে থিয়েলের দাবি, অনেকে টলকিনের উপন্যাসটি সঠিকভাবে বোঝেন না। তিনি বলেন, ‘গল্পের শেষদিকে ভালো চরিত্রগুলোই প্যালান্টির ব্যবহার করে। আরাগন এটি ব্যবহার করে সাউরনের মুখোমুখি হয় এবং শেষে সে পরাজিত হয়। টলকিনের এই গল্প যে অন্যভাবে বলে, সে সাহিত্যই বোঝে না।’