সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে শুক্রাণু দান করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডজনখানেক সন্তানের বাবা হওয়ার দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ বছর বয়সী কাইল গর্ডি। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারী এই ব্যক্তি নিজেকে একজন অনলাইন স্পার্ম ডোনার হিসেবে পরিচয় দেন এবং সম্ভাব্য গ্রহীতাদের জন্য একটি ওয়েবসাইট ও একাধিক ফেসবুক গ্রুপ পরিচালনা করেন।

কাইল গর্ডির দাবি, তার সন্তানদের মধ্যে স্কটল্যান্ডেও তিনজন রয়েছে। তিনি বলেন, নিজের প্রজননক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতে তিনি মদ্যপান ও ধূমপান করেন না, প্রতিদিন ৩০ ধরনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন, শুধুমাত্র জৈব খাবার খান এবং পরিশোধিত পানি পান করেন।

তিনি কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ পরিচালনা করেন, যেগুলোর সদস্যসংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি। এছাড়া সম্ভাব্য সন্তান নিতে আগ্রহীদের জন্য ‘বি প্রেগন্যান্ট নাউ’ নামে একটি ওয়েবসাইটও পরিচালনা করছেন।

তবে যুক্তরাজ্যে অর্থের বিনিময়ে শুক্রাণু বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শুক্রাণু দানের প্রস্তাব দেওয়া পুরুষের সংখ্যা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় শুক্রাণুদাতার সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিকল্প পথ খুঁজছেন।

যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস)-এ শুক্রাণুদাতার মাধ্যমে আইভিএফ চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও অনেক এলাকায় অপেক্ষার সময় দীর্ঘ। অন্যদিকে বেসরকারি ক্লিনিকে একবার আইভিএফ চিকিৎসার খরচ ১০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি হতে পারে।

সাবেক স্কটিশ এমপি হান্না বারডেল বলেন, দম্পতিরা এনএইচএসের আওতায় তিন দফা আইভিএফ সুবিধা পেলেও অবিবাহিত নারীরা অনেক ক্ষেত্রে সেই সুযোগ পান না। তার মতে, এ বৈষম্যের কারণেই অনেক নারী অনলাইন স্পার্ম ডোনারের দিকে ঝুঁকছেন।

কাইল গর্ডি বলেন, তিনি ক্লিনিকের মাধ্যমে নয়, সরাসরি নারীদের শুক্রাণু দিতে পছন্দ করেন। তার ভাষায়, এতে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও ব্যক্তিগত হয়। পাশাপাশি তিনি সন্তান ও তাদের মায়েদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাকেও নিজের নৈতিক দায়িত্ব মনে করেন।

তবে স্কটল্যান্ডের আরেক অনলাইন স্পার্ম ডোনার, যিনি পরিচয় গোপন রাখতে 'জেমস' নামে কথা বলেছেন, সতর্ক করে বলেন, অনিয়ন্ত্রিত এই পরিবেশ নারীদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তার দাবি, অনেক পুরুষই প্রকৃত সহায়তার জন্য নয়, বরং যৌন সম্পর্কের উদ্দেশ্যে স্পার্ম ডোনার হওয়ার প্রস্তাব দেন। অনেক নারী কৃত্রিম প্রজননের শর্তে সম্মতি দিলেও পরে তাদের স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কের জন্য চাপ দেওয়া হয়।

জেমস নিজেকে একজন নৈতিক স্পার্ম ডোনার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি কোনো ধরনের শর্ত বা ব্যক্তিগত প্রত্যাশা ছাড়াই সন্তান নিতে ইচ্ছুক নারীদের সহায়তা করতে চান।

বিবিসির সঙ্গে কথা বলা এক নারী জানান, এনএইচএসে তিন থেকে চার বছর অপেক্ষা করতে হবে জানার পর তিনি ফেসবুকে স্পার্ম ডোনার খুঁজতে শুরু করেন। শত শত প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র ছয়জনের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন।

তিনি বলেন, অনেকেই অশালীন বার্তা ও যৌন প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত যাকে তিনি বেছে নেন, তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে চারটি সন্তানের জৈবিক বাবা হয়েছেন এবং সন্তানদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

এদিকে যুক্তরাজ্যের মানব নিষেক ও ভ্রূণবিদ্যা কর্তৃপক্ষ অনলাইন স্পার্ম ডোনেশন নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত শুক্রাণু দান চিকিৎসা, আইনগত এবং মানসিক—তিন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই সংস্থার কৌশল ও করপোরেটবিষয়ক পরিচালক ক্লেয়ার এটিংহাউজেন বলেন, যুক্তরাজ্যে একজন অনুমোদিত শুক্রাণুদাতার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০টি পরিবারের সন্তান জন্ম দিতে দেওয়া হয়। কিন্তু অনলাইনে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের শতাধিক সন্তান রয়েছে বলে জানা গেছে।

ফেসবুকের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে শুক্রাণু দান নিয়ে আলোচনা করা গেলেও শুক্রাণু কেনাবেচা তাদের নীতিমালার পরিপন্থি। এ ধরনের নিয়মভঙ্গকারী পোস্ট বা গ্রুপ শনাক্ত হলে তা সরিয়ে ফেলা হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম