ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার সুবাদে বড় অঙ্কের মুনাফা লুটে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথিতে এই তথ্য উঠে এসেছে।

ওই নথির বরাত দিয়ে শুক্রবার রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভেঞ্চার গ্লোবালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গড় লিকুইফেকশন ফি বা গ্যাসে রূপান্তরকরণ মাশুল ৬৯ শতাংশ বেড়েছে।

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমা হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্বের মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণকারী দেশ কাতারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিশ্ববাজারে যে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণের জন্য মার্কিন উৎপাদকরা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। গত মার্চ মাসে ইরানের হামলায় কাতারের রাস লাফান হাব বা গ্যাসকেন্দ্রটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ওয়াশিংটন কাতারের সেই হারিয়ে যাওয়া কার্গোগুলো প্রতিস্থাপনের পদক্ষেপ নেয়। আর এটিই মার্কিন রপ্তানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।

প্রাথমিক হামলার পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যেই এশিয়ার স্পট মার্কেটে বা তাৎক্ষণিক বাজারে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। অন্যদিকে ইউরোপে এই দাম যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি রয়েছে। রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের বিকল্প হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের চড়া দামের এলএনজি বেছে নেওয়ার পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের অন্যতম হচ্ছে ভেঞ্চার গ্লোবাল।

প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, কোম্পানিটির গড় নির্ধারিত লিকুইফেকশন ফি প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (টিবিটিইউ) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৫ ডলারে, যা প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৩ দশমিক ৮২ ডলার। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট হলো জ্বালানিতে থাকা তাপশক্তির পরিমাপের একটি আদর্শ একক। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধসংক্রান্ত কারণে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ফলেই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। মার্কিন অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় ভেঞ্চার গ্লোবালের স্পট মার্কেটে বা তাৎক্ষণিক বাজারে ব্যবসা করার সুযোগ বেশি ছিল। কারণ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এলএনজির বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে বিক্রি করে থাকে। স্পট কার্গোর সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে রপ্তানিকারকরা বিশ্ব বাজারে দামের আকস্মিক ঊর্ধ্বগতির সুফল দ্রুত লুফে নিতে পারে। নথিতে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভেঞ্চার গ্লোবাল মোট ১২৭টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৩৭টি তাদের ক্যালকাসিউ পাস টার্মিনাল থেকে এবং ৯০টি প্লেকমিনস সুবিধা থেকে পাঠানো হয়েছে। এর বিপরীতে প্রথম প্রান্তিকে কার্গোর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩৮ ও ৯২টি। কোম্পানিটির প্রথম রপ্তানি টার্মিনাল ক্যালকাসিউ পাস ২০২২ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। এটি ভেঞ্চার গ্লোবালকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল। এর আগে ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটেরও ফায়দা নিয়েছিল কোম্পানিটি। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে, এই প্ল্যান্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণাধীন থাকা অবস্থাতেই তারা স্পট কার্গো বিক্রি করেছিল। কোম্পানিটির এই কৌশলের কারণে বেশ কয়েকটি বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করে। তাদের অভিযোগ ছিল, ভেঞ্চার গ্লোবাল চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না করে বেশি লাভের আশায় স্পট মার্কেটে তা বিক্রি করছে। তবে কোম্পানিটি এই অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অবশ্য কেবল ভেঞ্চার গ্লোবালই এই পরিস্থিতির একমাত্র সুবিধাভোগী নয়। বিশ্লেষকরা মার্কিন এলএনজি খাতের আরেক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান শেনিয়ের এনার্জিকেও এই সংকটের অন্যতম বিজয়ী হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।