একসময় সভ্যতার গৌরবের প্রতীক ছিল সিরিয়ার প্রাচীন নগরী পালমিরা। কিন্তু দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) তাণ্ডব ও ধারাবাহিক সংঘাতে সেই ঐতিহাসিক শহর পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। তবে ধুলো-মাটির নিচে চাপা পড়েনি পালমিরাবাসীর স্বপ্ন। যুদ্ধের গভীর ক্ষত বুকে নিয়ে আবারও পর্যটনের হাত ধরে ফিরতে শুরু করেছে পালমিরার হারিয়ে যাওয়া অর্থনীতি ও প্রাণচাঞ্চল্য। মিডল ইস্ট আই।

সংঘাতে বিধ্বস্ত এই ঐতিহাসিক শহরের পুনরুত্থানের অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে পর্যটন। ২০১৫ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) যখন পালমিরা দখল করে, তখন সিরিয়া ইতোমধ্যেই কয়েক বছর ধরে গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করছিল। পরবর্তী এক দশকে শহরটি কখনো আইএস, কখনো আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। একই সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপও যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র বদলে দেয়। প্রতিটি পক্ষই সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে শহরের ওপর গভীর ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়। যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আসছিল। পালমিরার মানুষ আইএসের নিষ্ঠুরতার প্রকৃত চেহারা বুঝতে সময় নিয়েছিল ৩০ দিন। শহর দখলের কিছুদিন পরই জঙ্গিগোষ্ঠীটি পালমিরার বিখ্যাত রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারে প্রকাশ্যে ২০ জনকে হত্যা করে। সিরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন তারা ভয়ের মঞ্চে পরিণত করে। আইএস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর তাদের নজর পড়ে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের দিকে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান পালমিরা একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসাবে পরিচিত ছিল। বহু মন্দির, স্মৃতিস্তম্ভ ও অসংখ্য প্রত্ননিদর্শনে সমৃদ্ধ এই নগরী আইএসের উগ্র মতাদর্শের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তারা পরিকল্পিতভাবে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসাবে পালমিরার বহু বিখ্যাত স্থাপনা ধ্বংস করে এবং বিপুলসংখ্যক প্রত্নবস্তু লুট করে আন্তর্জাতিক কালোবাজারে বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে। আইএস দখলদারির সময় সেখানে বসবাস করা স্থানীয় পর্যটক গাইদ খালিদ বলেন, ‘তারা দুই হাজার বছরের পুরোনো মমিগুলোও পুড়িয়ে ফেলেছিল।’ পালমিরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি বেল মন্দিরের মূল উপাসনাকক্ষ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। শুধু বাইরের ঘেরাটোপটি অক্ষত থাকায় সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। হাজার বছরের পুরোনো একটি পানির উৎসও ধ্বংস করে দেওয়া হয়। যার কারণেই একসময় পালমিরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ স্মরণ করেন, একসময় এই পথজুড়ে খেজুরগাছের সারি ছিল, বাড়ির সামনে বসে পরিবারগুলো পর্যটকদের চায়ের আমন্ত্রণ জানাত। কিন্তু আজ সেই পথ রুক্ষ রোদে উন্মুক্ত। চারপাশে শুধু যুদ্ধের আগুনে পোড়া মাটি, যা বছরের পর বছর চলা সংঘাতের নীরব সাক্ষী।