পঞ্চদশ সংশোধনী আইন নিয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে আজ বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ রায় দেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মো. শিশির মনির বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ে হাইকোর্ট চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, যা আপিল বিভাগের বহাল থাকল। যে বিষয়গুলো অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল— সংবিধানের কতগুলো বিষয় পরিবর্তন করলে তা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা, গণভোটের বিধান বাতিল, নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল।

তিনি বলেন, চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। এছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো ছিল এগুলো মহান জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধান কোনো দন্ডবিধি না। কেউ যদি অপরাধ করে অপরাধ ডিটারমিন করবে দন্ডবিধি। প্রসেস ফলো করবে ফৌজদারী কার্যবিধি। পৃথিবীর কোনো সংবিধানে শাস্তির কথা বলা থাকে না। আর সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে না —এটা সঠিক সিদ্ধান্ত না। ৫০ বছর পরে আমরা কেউই থাকব না, নতুন জেনারেশন আসবে, আন্ডারস্ট্যান্ডিং হবে, এডুকেশন হবে। এজন্য সংবিধানকে বলা হয় লিভিং ডকুমেন্ট। এটি সময় যুগের সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হয়। যদি বলি কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। তার মানে কি এটা বাইবেল? এটা কি কোরআন? আনসার ইজ নো। এজন্য এই পার্টটুকু বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সংসদে পাস হয়। সংশোধনীতে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয় সংশোধনীতে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে পৃথক রিট হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ ক, ৭ খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়।

গত বছরের ৮ জুলাই হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পৃথক লিভ টু আপিল করেন। এ ছাড়া মোফাজ্জল হোসেন নামের এক ব্যক্তি আরেকটি লিভ টু আপিল করেন।

চার বিশিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।

এদিকে রায়ের পর সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য মো. আবেদনকারী জুবাইরুল হক ভূইয়া বলেন, তিনি মনে করেন আপিল বিভাগের রায়ের ফলে সংবিধানের মৌলিক চেতনা ও মূল্যবোধ আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। এ রায় দেশের দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে।