সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি মালবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার জের ধরে ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ‘বোকামির মতো লঙ্ঘনের’ অভিযোগ আনার পর এই হামলা চালানো হলো।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত কেন্দ্র এবং উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকম এই হামলাকে বৃহস্পতিবার একটি মালবাহী জাহাজে চালানো ড্রোন হামলার ‘উপযুক্ত ও শক্তিশালী জবাব’ বলে অভিহিত করেছে। ওই ড্রোন হামলার কারণে ওই অঞ্চলে আটকে পড়া হাজার হাজার আন্তর্জাতিক নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার একটি পূর্বপরিকল্পিত অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয় জাতিসংঘ।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানি বাহিনীর এই অযাচিত আগ্রাসন স্পষ্টতই দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এ ছাড়া ইরানের এই বিপজ্জনক আচরণ নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ দিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয় অব্যাহত রাখবে।
অন্য দিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই উত্তেজনার জন্য ‘চুক্তি ভঙ্গকারী মার্কিন প্রশাসনকে’ দায়ী করেছে।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে অননুমোদিত রুট ব্যবহার করার অজুহাত দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলে বিমান হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি, নির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে চলায় ওই বাণিজ্যিক জাহাজটির ওপর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী এই মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য তারা দেয়নি। ইরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘যদি এই আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে আমাদের প্রতিক্রিয়া আরও ব্যাপক ও কঠোর হবে।’
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায় এবং সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ অচলাবস্থার পর গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত—আগামী ৬০ দিন ইরান কোনো প্রকার শুল্ক বা ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে যাতায়াত করতে দেবে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে সাড়ে তিন দিনের জন্য প্রণালীটি উন্মুক্ত করার পর তারা প্রায় ২ হাজার ৫০০ নাবিককে উদ্ধার করতে পেরেছে। তবে এখনো সেখানে প্রায় ১১ হাজার নাবিক আটকে রয়েছেন। নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের কারণে উদ্ধার অভিযান আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার আক্রান্ত হওয়া সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজটির নাম ‘এভার লাভলি’। তাইওয়ানের শিপিং কোম্পানি ‘এভারগ্রিন’-এর মালিকানাধীন এই জাহাজটি ইরাক থেকে পণ্য বোঝাই করে প্রায় ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ওই উপসাগরীয় এলাকায় আটকে ছিল।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত রুট দিয়ে যাওয়ার সময় ওমানের দাহিতে উপকূলের কাছে একটি অজ্ঞাত বস্তু জাহাজটির ব্রিজে আঘাত হানে। এভারগ্রিন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, হামলায় জাহাজের জানালার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সব নাবিক, মূল জাহাজ এবং পণ্য সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে।
এই ঘটনার পর মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ লিখেছেন, ‘চুক্তি কীভাবে কার্যকর করা হচ্ছে তা নিয়ে ইরানের কোনো দ্বিমত থাকলে তারা ফোনে কথা বলতে পারত। কিন্তু সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে।’
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলার পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি বহাল আছে কি না সে বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, ‘আপনারা শিগগিরই জানতে পারবেন। গতকাল তারা যে হামলাটি চালিয়েছে, তা আমার মোটেও পছন্দ হয়নি। তাদের এটি করা উচিত হয়নি।’
অন্য দিকে, ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাঝপথেই আবারও ইরানে হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধবিরতির এই বেপরোয়া লঙ্ঘন বরাবরের মতোই তাদের জন্য পশ্চাদপসরণ ও অনুশোচনা ডেকে আনবে। এসব ব্লেম গেম বা দোষারোপের রাজনীতি এখন আর কাজ করবে না।’








