ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটা ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই। পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন জ্বলছে। ইরাক–ইরানের যুদ্ধ চলছে। আশির দশকের শুরু থেকে টানা আট বছর ধরে চলেছে এ যুদ্ধ। পরে জাতিসংঘের উদ্যোগে যুদ্ধের লাগাম টানা হয়।
যাহোক, এখন যেমন যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে; তখনো ঠিক তেমনই হয়েছিল। কেননা, যুদ্ধের মধ্যে যেকোনো মূল্যে তেহরান পারস্য উপসাগর হয়ে ইরাকের জ্বালানি তেল রপ্তানি বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বড্ড বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানিবাহী নৌযানে মাইন পেতে রাখা, রকেট ছুড়ে জ্বালানিবাহী নৌযান ধ্বংস—এসব ঘটনা ছিল প্রায় নিত্যদিনের। শুধু ইরান একাই নয়, ইরাকও এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল।
অন্যদিকে ওই সময় ইরাকের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালির পাশে আন্তর্জাতিক জলসীমায় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স মোতায়েন করেছিল।
স্পষ্টত এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি—এক, হরমুজ প্রণালি হয়ে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুই, ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে তেহরানকে কৌশলগত চাপে রাখা।
পাল্টা পদক্ষেপ নেয় ইরান। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় সবচেয়ে কাছের বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশটি মোতায়েন করে এফ–১৪ যুদ্ধবিমান। যুদ্ধের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক—দুই কাজে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করা হচ্ছিল।
মার্কিন নাগরিকদের আশঙ্কা ছিল, ইরান এফ-১৪ যুদ্ধবিমান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানে হামলা চালাতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানায়, এটা একটি ‘মর্মান্তিক ও দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ ছিল। আর এর সবই হয়েছিল সকাল ১০টা ৪৭ মিনিট থেকে ১০টা ৫৪ মিনিট, অর্থাৎ মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে। সহজ করে বললে, উড্ডয়নের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয় ইরানের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি।
৩ জুলাই সকালবেলা, চারপাশে বেশ চমৎকার আবহাওয়া। হরমুজ প্রণালিঘেঁষা ইরানের বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়াল দিতে প্রস্তুত যাত্রীবাহী একটি উড়োজাহাজ। ইরান এয়ারের ফ্লাইট ৬৫৫ ছিল সেটি। এয়ারবাস এ-৩০০ মডেলের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটির গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই।
উড়োজাহাজটির সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে উড়াল দেওয়ার কথা ছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আধা ঘণ্টা বিলম্বে সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে বন্দর আব্বাস বিমানবন্দর থেকে উড়াল দেয় সেটি। দেশি-বিদেশি ২৭৪ জন যাত্রী ও ১৬ জন ক্রু ছিলেন। এর মধ্যে শিশু ছিল ৬৬টি।
তখন কে ভেবেছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যে বিশ্বের আকাশসেবা খাতের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডির শিকার হবে ফ্লাইট ৬৫৫। এটাই হবে শিশুসহ এই ২৯০ জনের জীবনের শেষ উড়াল।

সেদিন কী হয়েছিল
হরমুজ প্রণালিতে ওই সময় যুদ্ধের উত্তেজনা চলছিল। ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই ইরানের একটি এফ-১৪ যুদ্ধবিমান মার্কিন নৌযানের কাছাকাছি চলে আসে। পরে ক্রুজার ইউএসএস হেলসি থেকে সতর্ক করা হলে যুদ্ধবিমানটি ফিরে যায়।
৩ জুলাই সকালে হরমুজ প্রণালিতে একটি পাকিস্তানি ট্যাংকারকে ধাওয়া দেয় ইরানের গানবোট। শুরু হয় গোলাগুলি। ইউএসএস ভিনসেন্স আরেকটি মার্কিন ফ্রিগেট ইউএসএস মন্টেগোমারির পাশাপাশি থেকে লড়াই করছিল। পাকিস্তানি নৌযানটিকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার করে দেওয়া ছিল মার্কিন যুদ্ধজাহাজটির ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সি রজার্সের উদ্দেশ্য।
এত বড় একটি ট্র্যাজেডির মূল হোতা হিসেবে ইউএসএস ভিনসেন্সের ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সি রজার্সের কঠিন শাস্তি পাওয়ার কথা। এ জন্য তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা হয়েছিল। ১৯৯০ সালে ক্যাপ্টেন রজার্সকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সম্মানজনক ‘লিজিওন অব মেরিট’ পদক দেওয়া হয়।
বন্দর আব্বাস বিমানবন্দর থেকে মাত্রই উড়াল দিয়েছে ইরানের ফ্লাইট ৬৫৫। তখন মাঝ আকাশে সেটি, পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ছে। হঠাৎ দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে আসে। সরাসরি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটির বুক বরাবর আঘাত হানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র। মাঝ আকাশে ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায় ফ্লাইট ৬৫৫। উড়োজাহাজটিতে থাকা ৬৬ শিশুসহ ২৯০ জনের সবাই প্রাণ হারান।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে কেন এত আলোচনা, এটি বন্ধ হলে কোন দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেসাড়া দেননি পাইলট
হরমুজ প্রণালিতে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে হামলায় ২৯০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। অভিযোগ ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। বলা হয়েছিল, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ছোঁড়া হয়। তাতেই যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি সাগরে ভেঙে পড়ে।
অভিযোগ অস্বীকার করেনি যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। প্রতিবেদনে বলা হয়, সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটের পর ক্যাপ্টেন রজার্স একটি বার্তা পান। তাতে বলা হয়, ইরানের ‘অজ্ঞাত’ একটি উড়োজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্সের দিকে এগিয়ে আসছে।
রাডারে শনাক্ত হওয়ার পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে সতর্কবার্তা পাঠানো হলেও ইরানি উড়োজাহাজের পাইলট তাতে সাড়া দেননি। যদিও তখন ইরানের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি অনুমোদিত বাণিজ্যিক বিমানপথে ছিল। নিচে হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের বিষয়ে উড়োজাহাজটিকে আগাম সতর্ক করা হয়নি বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

‘ভুলের’ খেসারত
এ পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেন রজার্স মনে করেন, ইরানিরা হয়তো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার জন্য এফ-১৪ যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে। তিনি ‘বিপদ বুঝে’ অতিদ্রুত প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধজাহাজটি থেকে দুটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যায়। একটি আঘাত হানে ইরানি উড়োজাহাজটিতে।
পরবর্তী সময় তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানায়, এটা একটি ‘মর্মান্তিক ও দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ ছিল। আর এর সবই হয়েছিল সকাল ১০টা ৪৭ মিনিট থেকে ১০টা ৫৪ মিনিট, অর্থাৎ মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে। সহজ করে বললে, উড্ডয়নের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয় ইরানের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, এ ঘটনা আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটেছে। যদিও পরে সেটা ভুল প্রমাণিত হয়। উড়োজাহাজটি ইরানের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় হামলার শিকার হয়েছিল। বলা হয়, অনুমোদিত বাণিজ্যিক বিমানপথে উড়োজাহাজটি নির্ধারিত গতির চেয়ে ধীরে আসার কারণে এই ‘ভুল’ হয়েছে।
২৯০ আরোহীসহ ইরানের উড়োজাহাজ কেন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ধ্বংস করেছিল যুক্তরাষ্ট্রসমঝোতায় সমাপ্তি
ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উড়োজাহাজ ধ্বংস এবং ২৯০ আরোহীকে ‘হত্যার’ অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যায় ইরান। দেশটি ১৯৮৯ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে। শুরু হয় বিচার। কিন্তু সেটা আর শেষ হয়নি।
আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির মিটমাট করে নেয় ওয়াশিংটন আর তেহরান। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে দুপক্ষ সমঝোতায় পৌঁছায়। উড়োজাহাজ ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ইরানকে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেয় ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ‘গভীর সহানুভূতি’ জানানো হয়।
ক্ষতিপূরণ পেয়ে ইরান আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে অভিযোগ তুলে নেয়। এতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি অধিকারকর্মী—অনেকেই নিন্দা জানান। তবে ইরানিদের কাছে নিহত ২৯০ জন শহীদের মর্যাদা পেয়েছেন। আজও বছরান্তে শ্রদ্ধাভরে তাঁদের স্মরণ করা হয়।

শাস্তির বদলে পুরস্কার
এত বড় একটি ট্র্যাজেডির মূল হোতা হিসেবে ইউএসএস ভিনসেন্সের ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সি রজার্সের কঠিন শাস্তি পাওয়ার কথা। এ জন্য তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা হয়েছিল। পুরস্কৃত হয়েছিলেন রজার্স।
১৯৯০ সালে ক্যাপ্টেন রজার্সকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সম্মানজনক ‘লিজিওন অব মেরিট’ পদক দেওয়া হয়। পেশাজীবনে ‘অসামান্য অবদানের’ স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ পদক পান।
এ ঘটনার কড়া সমালোচনা করেছিলেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। সময়টা ২০১৯ সাল। রুহানি তখন ক্ষমতায়। ফ্লাইট ৬৫৫ ট্র্যাজেডির বর্ষপূর্তির সময় মন্ত্রিসভার বৈঠকে রুহানি বলেন, ‘এমন ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। মার্কিন নাগরিকেরা এ জন্য আজও ক্ষমা চায়নি। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেনকে শাস্তি দেয়নি, পুরস্কৃত করেছে। ঠান্ডা মাথায় বড় অপরাধ করেছে।’
রুহানির আমলে বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন নাম রাখা হয় ‘ফ্লাইট ৬৫৫ শহীদ বিমানবন্দর’।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, ইরান ফ্রন্ট পেজ নিউজ ও ব্রিটানিকা।
হরমুজ প্রণালি খোলা, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারসহ যা যা থাকছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে







