সামিন ইয়াসার

উনিশ দিনের অচলাবস্থার পর যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতা থেকে মুক্তি পেয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সর্বশেষ ও সবচেয়ে সক্ষম মডেল ক্লড ফেবল ৫। গত ১ জুলাই থেকে বিশ্বজুড়ে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য মডেলটি পুনরায় চালু হয়েছে, যা প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উন্মোচন থেকে হঠাৎ কেন নিষেধাজ্ঞা

গত ৯ জুন অ্যানথ্রপিক একসঙ্গে দুটি নতুন মডেল উন্মুক্ত করে ক্লড ফেবল ৫ এবং ক্লড মিথোস ৫। দুটি মডেলই একই মূল কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও তাদের ব্যবহারের ক্ষেত্র ভিন্ন। ফেবল ৫ ছিল কোম্পানির নতুন ‘মিথোস-স্তরের’ প্রথম মডেল, যা সাধারণ গ্রাহক ও এন্টারপ্রাইজ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, শক্তিশালী নিরাপত্তা স্তরসহ। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম বিধিনিষেধযুক্ত মিথোস ৫ কেবল অ্যানথ্রপিকের ‘প্রজেক্ট গ্লাসউইং’ কর্মসূচির আওতায় বাছাই করা কিছু প্রতিষ্ঠানকে প্রতিরক্ষামূলক সাইবার নিরাপত্তা কাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল।

তবে উন্মোচনের মাত্র তিন দিনের মাথায়, ১২ জুন সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে একটি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নির্দেশনা জারি করে। এতে বিশ্বের যেকোনো স্থানে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য-এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব বিদেশি কর্মীদের জন্যও এই দুই মডেলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল আনছে মাইক্রোসফট

যেহেতু বাস্তবসম্মতভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারকারীর নাগরিকত্ব যাচাই করার কোনো কারিগরি ব্যবস্থা ছিল না, তাই অ্যানথ্রপিক বাধ্য হয়ে বিশ্বজুড়ে সব ব্যবহারকারীর জন্যই দুটি মডেল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ক্লড প্ল্যাটফর্ম, ক্লড.এআই, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, গুগল ক্লাউড ও মাইক্রোসফট ফাউন্ড্রিসহ সব মাধ্যম থেকেই মডেল দুটি একযোগে সরিয়ে ফেলা হয়। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত কোনো এআই মডেলের বিরুদ্ধে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার এমন ব্যাপক প্রয়োগ সাম্প্রতিক সময়ে বিরল বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকেরা।

নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যের কারণ

মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল অ্যামাজনের গবেষকদের একটি প্রতিবেদন। তাতে দাবি করা হয়, নির্দিষ্ট কৌশলে প্রশ্ন সাজিয়ে ফেবল ৫-এর নিরাপত্তা স্তর এড়িয়ে সফটওয়্যারের কিছু দুর্বলতা শনাক্ত করানো সম্ভব হয়েছে এবং একটি ক্ষেত্রে মডেলটি সেই দুর্বলতা কাজে লাগানোর কোড পর্যন্ত তৈরি করে দিয়েছিল। জানা যায়, অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি নিজেই বিষয়টি মার্কিন কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন।

অ্যানথ্রপিক অবশ্য শুরু থেকেই এই উদ্বেগের মাত্রা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যমতে, চিহ্নিত দুর্বলতাগুলো আগে থেকেই পরিচিত এবং তুলনামূলক সাধারণ মানের, যা ক্লড অপাস ৪.৮, জিপিটি-৫.৫ কিংবা কিমি কে২.৭-এর মতো বাজারে থাকা অন্যান্য মডেল দিয়েও একইভাবে খুঁজে বের করা সম্ভব। তাদের যুক্তি, একটি সংকীর্ণ ও অ-সর্বজনীন কৌশলের ভিত্তিতে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানো একটি বাণিজ্যিক মডেল সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করাটা সংগতিপূর্ণ নয়। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে বলেছিল, পুরো খাতে এই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হলে ভবিষ্যতে যেকোনো নতুন এআই মডেল উন্মোচনই কার্যত থমকে যেতে পারে।

আলোচনা ও ধাপে ধাপে প্রত্যাবর্তন

নিষেধাজ্ঞা জারির পর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ অ্যানথ্রপিক মার্কিন সরকার ও অ্যামাজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি উন্নত নিরাপত্তা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা তৈরি করে, যা নির্দিষ্টভাবে সেই রিপোর্ট করা কৌশলকে লক্ষ্য করে কাজ করে এবং এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২৬ জুন মার্কিন বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লুটনিক আংশিক ছাড় দিয়ে প্রায় শতাধিক যাচাই করা প্রতিষ্ঠানকে মিথোস ৫ ব্যবহারের অনুমতি দেন। এরপর ৩০ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়, এবং ১ জুলাই থেকে ফেবল ৫ ক্লড প্ল্যাটফর্ম, ক্লড.এআই, ক্লড কোড ও ক্লড কোওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সব ব্যবহারকারীর জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয়।

প্রো, ম্যাক্স, টিম এবং নির্দিষ্ট কিছু এন্টারপ্রাইজ পরিকল্পনার গ্রাহকেরা আগামী ৭ জুলাই পর্যন্ত সাপ্তাহিক ব্যবহারসীমার একটি বড় অংশ বিনামূল্যে ফেবল ৫-এ ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, গুগল ক্লাউড ও মাইক্রোসফট ফাউন্ড্রির মতো ক্লাউড প্ল্যাটফর্মেও শিগগিরই প্রবেশাধিকার পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে মিথোস ৫ এখনো মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ও প্রজেক্ট গ্লাসউইং অংশীদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন নিরাপত্তা কাঠামো

পুনরায় চালুর পর ফেবল ৫-এ একটি বাড়তি সুরক্ষা স্তর যুক্ত করা হয়েছে। এখন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত অনুরোধের একটি ছোট অংশ (প্রায় ৫ শতাংশ সেশনে) স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুলনামূলক কম সক্ষম মডেল অপাস ৪.৮-এর দিকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং এমন ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে তা জানিয়েও দেওয়া হয়।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

এই ঘটনাকে দেখা হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত কোনো এআই মডেলের বিরুদ্ধে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার সবচেয়ে কঠোর প্রয়োগগুলোর একটি হিসেবে। এটি ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন অ্যানথ্রপিক ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক ইতিমধ্যেই বেশ উত্তপ্ত এর আগে ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটিকে ‘সরবরাহ শৃঙ্খল ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, কারণ গণনজরদারি ও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থায় নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহারে অ্যানথ্রপিক বিধিনিষেধ শিথিল করতে রাজি হয়নি। শিল্প-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ১৯ দিনের বিরতি চীনের ঝিপু বা আলিবাবার কোয়েন সিরিজের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোকে ব্যবধান কমানোর বাড়তি সময় করে দিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের অনেক অংশীদার প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ওপর এমন নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আরও পড়ুন

একদিনে ৪৮০০ কর্মী ছাঁটাই করলো মাইক্রোসফট

তবে সব মিলিয়ে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট সাময়িক অনিশ্চয়তার পর ফেবল ৫ এখন আবার সবার নাগালে। যারা কোডিং, গবেষণা কিংবা জটিল বিশ্লেষণী কাজে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে সক্ষম ক্লড মডেলটির ওপর নির্ভর করছিলেন, তাদের জন্য এই প্রত্যাবর্তন স্বস্তির খবর। তবে অধিকতর সক্ষম ও কম বিধিনিষেধযুক্ত মিথোস ৫ আপাতত বিশেষায়িত সাইবার নিরাপত্তা কাজের বাইরে সাধারণ ব্যবহারকারীদের নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

সূত্র: অ্যানথ্রপিকের দাপ্তরিক ঘোষণা এবং সিএনবিসি, ফোর্বস ও মার্কেটস্কেল

লেখক: প্রযুক্তি লেখক ও পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষক।

কেএসকে