১৩ জুলাই, ১৯৩০। ফুটবল ইতিহাসের এমন একদিন, যেদিন পৃথিবী প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু হলো বিশ্বকাপ ফুটবলের। আজ যে টুর্নামেন্টকে ঘিরে পুরো পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়, কোটি কোটি মানুষ টিভির সামনে বসে, সেই বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল অবিশ্বাস্যভাবে ছোট পরিসরে। মাত্র ১৩টি দল, তিনটি স্টেডিয়াম এবং এক দেশ- উরুগুয়ে।

কিন্তু সেই ছোট্ট সূচনাই আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে পরিণত হয়েছে। ১৯২৮ সালে ফিফা সভাপতি জুলে রিমে সিদ্ধান্ত নেন, অলিম্পিকের বাইরে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে।

প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় উরুগুয়ে। কারণ ১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিকে তারা ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন, ১৯৩০ সালে দেশটির স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি, সরকার বিদেশি দলগুলোর যাতায়াত ও থাকার পুরো খরচ বহনের ঘোষণা দেয়।

তবুও ইউরোপের অনেক দেশ অংশ নিতে চায়নি। সমুদ্রপথে প্রায় দুই সপ্তাহের দীর্ঘ যাত্রা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ত সূচির কারণে অনেকেই পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মাত্র চারটি ইউরোপীয় দল অংশ নেয়- ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া।

১৩ জুলাই ১৯৩০ সালে একই সময়ে দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। তবে ফ্রান্স বনাম মেক্সিকো ম্যাচটিই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃত। প্রথম ম্যাচে ফ্রান্স ৪-১ ব্যবধানে হারায় মেক্সিকোকে।

ম্যাচের মাত্র ১৯ মিনিটে লুসিয়েন লরাঁ বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোল করেন। এরপর মার্সেল ল্যাঙ্গিলার, আন্দ্রে মাসিনো (দুই গোল) ফ্রান্সকে বড় জয় এনে দেন মেক্সিকোর হয়ে হুয়ান কারেনো প্রথম বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার প্রথম গোলটি করেন। আজও লুসিয়েন লরাঁর সেই গোল বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা।

একই সময়ে অন্য মাঠে যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাস গড়ে। বার্ট ম্যাকগি, টম ফ্লোরি ও বার্থ প্যাটেনাউদে জালে বল পাঠিয়ে ৩-০ ব্যবধানে হারায় বেলজিয়ামকে। অনেকেই ভুলে যান, কিন্তু প্রথম বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র দুর্দান্ত খেলেছিল। তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক ছিল।

আজকের বিশ্বকাপ মানেই লাখো দর্শক, বিলিয়ন টিভি ভিউয়ার, বিশাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। কিন্তু ১৯৩০ সালে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। অনেক স্টেডিয়ামে আসন ফাঁকাই ছিল। বিশ্বকাপ যে শুরু হয়েছে, পৃথিবীর বহু মানুষই তা জানত না। টেলিভিশন সম্প্রচার ছিল না। রেডিও এবং সংবাদপত্রই ছিল খবরের একমাত্র মাধ্যম। তবুও মাঠে উপস্থিত দর্শকদের কাছে এটি ছিল এক নতুন যুগের সূচনা।

প্রথম বিশ্বকাপে মাত্র ১৩টি দল অংশ নেয়, কোনো বাছাইপর্ব ছিল না, খেলোয়াড়দের অনেকেই ছিলেন অপেশাদার, অনেক দল জাহাজে করে ১৫-২০ দিন ভ্রমণ করে উরুগুয়েতে পৌঁছায়, বল, জার্সি এবং সরঞ্জাম আজকের তুলনায় ছিল অত্যন্ত সাধারণ।

স্বাগতিক উরুগুয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে। প্রায় ৯৩ হাজার দর্শকে ভরা মন্টেভিডিওর সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে উরুগুয়ে।

১৯৩০ সালে যে টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল মাত্র ১৩টি দল নিয়ে, সেটিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর। এখন ৪৮টি দল বিশ্বকাপ খেলছে, শত শত দেশের কোটি কোটি মানুষ এই টুর্নামেন্টের অপেক্ষায় থাকে, আর প্রতিটি ম্যাচ পৃথিবীর নানা প্রান্তে একযোগে সম্প্রচারিত হয়।

তবু সবকিছুর শুরু ছিল ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই- ফ্রান্সের ৪-১ ব্যবধানে মেক্সিকোকে হারানো এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৩-০ ব্যবধানে বেলজিয়ামকে হারানোর মধ্য দিয়ে।

সেদিন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, এই ছোট্ট টুর্নামেন্ট একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসবে পরিণত হবে। ১৩ জুলাই তাই শুধু একটি তারিখ নয়- এটি বিশ্বকাপের জন্মদিন, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।

আরআর/আইএইচএস/