নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া জেলা দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর মধ্যে দেওনাই-যমুনেশ্বরী-করতোয়া সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নদীর পানি বহন করছে। দেওনাই, যমুনেশ্বরী, করতোয়া তিনটি নদ–নদীকে একসঙ্গে বলার কারণ হলো, উজানে যা দেওনাই, মধ্যবর্তী অংশে সেটা যমুনেশ্বরী, ভাটিতে তা-ই করতোয়া। রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থেকে নদীটি করতোয়া নামে প্রবাহিত। ছোট ছোট ৩৬টি নদীর পানি মিলিয়ে বগুড়ার করতোয়া। এই ৩৬টির বাইরে এ রকম আরও নদী থাকা অস্বাভাবিক নয়।
করতোয়া নদীর সর্ব–উজানের অংশ দেওনাই নদ। নীলফামারী জেলার ডোমারে এই নামে পরিচিত। নদটি ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। দীর্ঘদিন নদটি উৎসস্থলে কোন নামে পরিচিত কিংবা বাংলাদেশে কোন নামে প্রবেশ করেছে, এর হদিস জানা ছিল না।
বছর তিনেক আগে রিভারাইন পিপল নীলফামারী জেলার সমন্বয়কারী আবদুল ওয়াদুদকে অনুরোধ করেছিলাম, বাংলাদেশে প্রবেশের অংশে নদটির খোঁজ নেওয়ার জন্য। তিনি খোঁজ নিয়ে আমাকে জানান, নদীটি পাংঘা ও খোড়ুয়া নামে দুটি নদীর মিলিত নাম দেওনাই। খোড়ুয়া ও পাংঘা নদী দুটি ভারত থেকে এসেছে। এই তথ্য আগে কোথাও ছিল না।
এর কিছুদিন পর রংপুর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে আমরা কয়েকজন নদীকর্মী মিলে পাংঘা ও খোড়ুয়া নদী দেখতে গেলাম। এপ্রিল-মে মাসের দিকে গিয়েছিলাম তখন প্রচণ্ড রোদ ছিল। দেখলাম, নদী দুটি শুকিয়ে কাঠ। স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে জানতে পারি—আগে এ দুটি নদীতে পানি থাকত। কয়েক বছর ধরে একেবারেই শুকিয়ে যায়।
চেকাডোরা নদীর পানি নিয়ে শালকি নদ ডোমার উপজেলা শহরের কাছে দেওনাই নদে মিলিত হয়েছে। চেকাডোরা নদীটি প্রস্থে কম হলেও বর্ষায় তীব্র বেগে পানি প্রবাহিত হয়। শালকি-দেওনাই নদের মিলনস্থল দারুণ সৌন্দর্যময়। সুই নদ, গুপ্তবাসিনী নদীও দেওনাই নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। হরিণচরা ইউনিয়নে দেওনাই নদের একটি শাখানদী বেরিয়ে যায়। এই শাখা তিন-চার কিলোমিটার দূরে কলমদার নদ ও বুড়ীখোড়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থেকে চারা নামে একটি নদী বুড়ীখোড়ায় মিলেছে। যমুনেশ্বরী নদী দেওনাই নদে মিলে যমুনেশ্বরী নাম নিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ধল্লা নদী দেওনাই নদ ও চাড়ালকাটা নদীর উপনদী, বামনডাঙ্গা চারা (নীলফামারী) নদীর উপনদী। চারা, বুড়ীখোড়া, দোধরা, গড়াঙ্গী, নেংটিছেঁড়া, বাগডোকরা নদী মিলেছে চিকলি নদে। চিকলি মিলিত হয়েছে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ পৌরসভায় যমুনেশ্বরীর সঙ্গে।
মরা ধাইজান ও ধাইজান নামে দুটি নদ যমুনেশ্বরীতে মিলেছে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের উজানে, মহাসড়কের ভাটিতে মিলেছে খাড়ুভাজ নদ। বদরগঞ্জের দক্ষিণে অনেক পুরোনো মরা তিস্তা, ভেলামতী নদী এবং কাঠগড়ি নদের পানিও যমুনেশ্বরী নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। নীলফামারীর বাঙালীপুর ইউনিয়নের কাছে করতোয়া নদীর অনেক পুরোনো একটি প্রবাহ আছে। এই প্রবাহ সোনামণি নদের সঙ্গে বদরগঞ্জে মিলিত হয়ে নাম হয়েছে ঘিরনই। রংপুরের বদরগঞ্জে খটখটিয়া মিলেছে ঘিরনই নদে।

ঘিরনই নদ রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় যমুনেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর যমুনেশ্বরীর নাম হয়েছে করতোয়া। এই করতোয়া বগুড়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মাইলা নামের একটি নদী পীরগঞ্জে এ নদীতে পড়েছে। কালা, সোনামতি, ছোট আখিরার পানি আখিরা নদী গ্রহণ করার পর মিলিত হয় করতোয়া নদীতে। গাভনাই নদও মিলেছে করতোয়ায়।
আমরা বাংলাদেশে প্রধান তিনটি অববাহিকার কথা বলে থাকি—গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা। এই তিন অববাহিকার কথা সর্বাধিক প্রচলিত। যমুনেশ্বরী ও করতোয়া নদী যত নদীর পানি গ্রহণ করেছে, এগুলোকে একসঙ্গে করে দেখলে নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলা থেকে শুরু করে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত দেওনাই-যমুনেশ্বরী-করতোয়া অববাহিকাও কম সমৃদ্ধ নয়।
প্রশ্ন হলো, এতগুলো নদীর পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হওয়ার পরও বগুড়ায় করতোয়া নদীতে পানি নেই কেন? করতোয়া নদীটির হত্যাকারী প্রতিষ্ঠানের নাম পানি উন্নয়ন বোর্ড। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খুলসী নামক স্থানে ৮-১০ ফুট প্রস্থের একটি স্লুইসগেট দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে সেখানে করতোয়া নদী ছিল অন্তত ৩০০ ফুট। ৩০০ ফুট নদীর পানি যখন মাত্র ৮-১০ ফুট স্লুইস গেট দিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তখন কার্যত বগুড়ায় আর উজানের পানি যায় না। এই পানি কাটাখালী-বাঙালী নদী হয়ে প্রবাহিত হয়।
বগুড়ায় করতোয়া নদী সুরক্ষার জন্য ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্প ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কাজে আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত করতোয়ায় পানির প্রবাহ ফেরানো না যায়। গলা টিপে একটি নদীকে মেরে ফেলে সেটিকে বাঁচানোর চেষ্টা ছাড়াই আবার সেই নদীতে প্রকল্প গ্রহণ যথাযথ মনে হয় না। পাউবোতে দেশের অসংখ্য মেধাবী আছেন। বুয়েটসহ দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠান যখন নদী হত্যাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তখন এই দুঃখ বর্ণনার ভাষা থাকেন না।
করতোয়া নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল পুণ্ড্রনগরী। এ নদীর তীরেই এ অঞ্চলের সভ্যতা বিকশিত হয়েছে। ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় এর গতিপ্রকৃতি বদলে গেলেও ৩৬ নদীর পানি নিয়ে বর্তমানের প্রবাহ স্বাস্থ্যবান ছিল। এই নদীর প্রবাহ বন্ধ করার কারণেই নদীটি প্রাণ হারাতে শুরু করে। মাঝবয়সী মানুষেরাও এ নদীতে নৌযান চলাচল দেখার গল্প করেন। এখন প্রবাহ নেই, নৌপথ নেই, আছে কেবল দখল আর দূষণ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান সরকার ১ হাজার ৯৪ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। স্লুইস গেট বর্তমান অবস্থায় রেখে নদীটির সুরক্ষা একেবারেই অসম্ভব।
বাংলাদেশে করতোয়া নদী একটি বড় দৃষ্টান্ত। উজানে প্রায় ৩৬টি নদীর পানি নিয়ে প্রবাহিত হলেও পাউবো কত সহজে সেই নদী মেরে দিতে পারে। এ রকম অসংখ্য নদীকে পাউবো মেরেছে। দীর্ঘদিন ধরে নদী নিয়ে অনেক কথা হলেও পাউবো, তথা সরকারের স্লুইসগেট অপসারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
খুলসী স্লুইসগেট অপসারণ করে করতোয়া নদীর পানিপ্রবাহ সচল করতে কি হাজার হাজার কোটি টাকা লাগবে? নাকি এটি পাউবোর প্রকল্প গ্রহণের হাতিয়ার? বগুড়ার ভাটিতেও নদীটির ওপর নানান অত্যাচার আছে। করতোয়া নদীতে বড় প্রকল্প গ্রহণ করা না করার সঙ্গে স্লুইসগেট অপসারণ, কিংবা দখল-দূষণ রোধ করার কোনো সম্পর্ক নেই। আগে করতোয়া বাঁচানো হোক, পরে বড় প্রকল্প!
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক








