নদী যত বড় হয়, তার শুকিয়ে যেতে তত বেশি সময় লাগে। অনেক আগে থেকেই তার ভেতরে পলি জমে, প্রবাহ কমে, এখানে-ওখানে চর জেগে ওঠে। তখনও বাইরে থেকে নদীকে বিশাল দেখালেও ভেতরে ভেতরে তার শক্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে। কর্পোরেট জগতের সংকটও অনেকটা তেমন।
সিটি গ্রুপকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা তাই শুধু ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের কর্পোরেট অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা কিছু বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
এখনও বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজারে ‘তীর’ হচ্ছে আস্থার প্রতীক। আর তীর মানেই সিটি গ্রুপ। দেশের কোটি কোটি মানুষের রান্নাঘরে তাদের নীরব এবং শক্তিশালী উপস্থিতি। প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ব্যবসা, ২৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান এবং কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি তাদেরকে দেশের অন্যতম সফল শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত করেছিল।
কিন্তু আজ সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দেশের ৩৬টি ব্যাংকে একসঙ্গে বসে ঋণ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে এই অবস্থায় এল?
আমরা সাধারণত কর্পোরেট সংকটের ব্যাখ্যা খুঁজি দুই চরম প্রান্তে। আমরা ভাবি হয় সেখানে দুর্নীতি আছে, নয়তো আছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি হিসাব বড় জটিল। পৃথিবীর বড় বড় ব্যবসায়িক বিপর্যয়ের ইতিহাস বলছে, অনেক সময় সফল প্রতিষ্ঠানও নিজেদের সাফল্যের ভারে নুয়ে পড়ে।
১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার বহু বিখ্যাত চেবোল বা শিল্পগোষ্ঠী ধসে পড়েছিল। তারা কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল না, তবে তারা ছিল অতিরিক্ত ঋণনির্ভর। একইভাবে ২০০৮ সালে বিশ্বের বৃহত্তম বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর একটি লেহম্যান ব্রাদার্স-এরও পতন হয়েছিল মূলত ঝুঁকির ভুল মূল্যায়ন এবং অতিরিক্ত লিভারেজের কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের এভারগ্রান্ডের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সংকটও আমাদের একই শিক্ষা দিয়েছে।
অর্থনীতির একটি নিষ্ঠুর নিয়ম আছে। আয় না এলে ঋণ কখনো ব্যবসার বন্ধু হয় না। বরং ধীরে ধীরে শত্রুতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো, একটি খাতে সাফল্য অর্জনের পর তারা দ্রুত নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। তাতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির গতি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
বাংলাদেশে গত এক দশকে আমরা দেখেছি, অনেক শিল্পগোষ্ঠী খাদ্যপণ্য থেকে বিদ্যুৎ, রিয়েল এস্টেট থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিপিং থেকে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে প্রবেশ করেছে। এই সম্প্রসারণের বড় অংশই হয়েছে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে। এখানেই একটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
বাংলাদেশে গত এক দশকে আমরা দেখেছি, অনেক শিল্পগোষ্ঠী খাদ্যপণ্য থেকে বিদ্যুৎ, রিয়েল এস্টেট থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিপিং থেকে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে প্রবেশ করেছে। এই সম্প্রসারণের বড় অংশই হয়েছে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে। এখানেই একটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়ন হয় বন্ড বাজার, প্রাইভেট ইকুইটি, পেনশন ফান্ড বা বিশেষায়িত অবকাঠামো তহবিলের মাধ্যমে। বাংলাদেশে সেই বিকল্প নেই বললেই চলে। ফলে ব্যাংকই হয়ে উঠেছে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি উভয় অর্থায়নের প্রধান উৎস।
এর ফলাফল হচ্ছে, অনেক সময় এক বছরের কার্যকর মূলধনী ঋণ পাঁচ বা সাত বছরের প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ যে গাছের ফল আসতে সময় লাগবে, তার জন্য ধার করা হচ্ছে এমন টাকা, যার কিস্তি আগামী মৌসুমেই পরিশোধ করতে হবে। এটিকে অর্থনীতির ভাষায় বলে ম্যাচিউরিটি মিসম্যাচ।
সিটি গ্রুপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই সমস্যার একটি বড় উদাহরণ বলেই মনে হচ্ছে।
এরপর আসে সামষ্টিক অর্থনীতির ধাক্কা।
সিটি গ্রুপের সংকট: একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প, নাকি একটি ব্যবস্থার সতর্কবার্তা২০২১ সালে যে ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, সেটি গত পাঁচ বছরের মধ্যে ১২২-১২৫ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন প্রায় ৪৫ শতাংশ। একটি আমদানি নির্ভর শিল্পগোষ্ঠীর জন্য এর অর্থ হলো, একই পরিমাণ কাঁচামাল কিনতে আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বেশি টাকা প্রয়োজন।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করে। ৮৫ টাকা ডলারে এর মূল্য ছিল ৮,৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু ১২৩ টাকা ডলারে সেই ব্যয় দাঁড়ায় ১২,৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ কোনো উৎপাদন না বাড়িয়েও অতিরিক্ত প্রায় ৩,৮০০ কোটি টাকার চাপ তৈরি হয়।
একই সময়ে সুদের হারও বেড়েছে। কয়েক বছর আগে যে ঋণের সুদ ছিল ৭ থেকে ৯ শতাংশ, সেটি অনেক ক্ষেত্রে ১১ থেকে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবসাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতির ভাষায় একে বলে পারফেক্ট স্ট্রম। অর্থাৎ একসঙ্গে কয়েকটি প্রতিকূল ঘটনা একই দিকে আঘাত করেছে।
কিন্তু এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় শিল্পগোষ্ঠী মূলত প্রতিষ্ঠাতাকেন্দ্রিক। প্রতিষ্ঠাতা শুধু মালিকই নন, তিনি প্রতিষ্ঠানের কৌশল, সংস্কৃতি, সম্পর্ক এবং আস্থার কেন্দ্রবিন্দু। ব্যাংকাররা অনেক সময় ব্যালান্সশিটের চেয়ে সেই মানুষটিকে বেশি বিশ্বাস করেন।
পৃথিবীর পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রজন্মে টিকে থাকে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় প্রজন্মে সেই সংখ্যা নেমে আসে ১২ শতাংশের কাছাকাছি। কারণ ব্যবসা পরিচালনা করা আর ব্যবসা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা ক্রমশ সামনে আসছে। বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় উত্তরণ। সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হচ্ছে।
তবে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত আলোচনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জালিয়াতি, সম্পদ পাচার বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির কোনো অভিযোগ আসেনি। বরং ব্যাংকগুলো এটিকে একটি কার্যকর ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করছে, যার নগদ প্রবাহে সমস্যা হয়েছে কিন্তু ব্যবসায়িক ভিত্তি এখনো অক্ষত।
এ কারণেই ৩৬টি ব্যাংক একসঙ্গে পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নও রয়েছে। বাংলাদেশ কি প্রতিটি কর্পোরেট সংকটকে শাস্তির চোখে দেখবে, নাকি পুনরুদ্ধারের সুযোগও সৃষ্টি করবে?
যুক্তরাষ্ট্রে চ্যাপ্টার ইলাভেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় করপোরেট ওয়ার্কআউট প্রোগ্রাম কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন পুনর্গঠন ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো, একটি কার্যকর ব্যবসাকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পতন শুধু মালিকের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংক ঋণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতি।
সিটি গ্রুপের ২৫ হাজার কর্মী, শত শত সরবরাহকারী, হাজারো পরিবেশক এবং কোটি ভোক্তার সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ ভেঙে পড়লে তার অভিঘাত ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের বাইরে গিয়েও ছড়িয়ে পড়ে।
তবে পুনর্গঠন মানে দায়মুক্তি নয়।
পুনর্গঠন তখনই অর্থবহ, যখন তার সঙ্গে থাকে স্বাধীন নিরীক্ষা, নগদ প্রবাহের স্বচ্ছতা, সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন, পরিচালনাগত সংস্কার এবং জবাবদিহি। এসক্রো অ্যাকাউন্ট, ওয়াটারফল ম্যাকানিজম, ব্যাংক মনিটরিং কমিটি কিংবা ইন্ডিপেন্ডেন্ট অডিট-এর মতো উদ্যোগগুলোও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর বিশ্বাস টিকে থাকে স্বচ্ছতার ওপর।
সিটি গ্রুপের সংকট আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় আয়না তুলে ধরেছে। সেই আয়নায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মুখ নয়, পুরো কর্পোরেট অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে।
আমরা কি এখনও ব্যাংকঋণকে প্রবৃদ্ধির একমাত্র জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করব? আমরা কি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বাজার গড়ে তুলব? আমরা কি উদ্যোক্তাদের আরও শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের দিকে নিয়ে যেতে পারব? আমরা কি প্রতিষ্ঠাতানির্ভর ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর ব্যবসায় রূপান্তর করতে পারব?
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত শুধু সিটি গ্রুপের ভবিষ্যৎ নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি কি এই সংকটকে একটি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখবে, নাকি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করবে?
কারণ নদী শুকিয়ে যাওয়ার আগে যদি পলির উৎস চিহ্নিত করা যায়, তাহলে নদীকে আবারও প্রবাহমান করা সম্ভব। কিন্তু যদি আমরা শুধু শুকিয়ে যাওয়া নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি, তাহলে একদিন হয়তো দেখব, সংকটটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ছিল না; সংকটটি ছিল পুরো ব্যবস্থার।
আশানুর রহমান পেশায় ব্যাংকার ও কথাসাহিত্যিক
মতামত লেখকের নিজস্ব








