একটি দেশের গণতন্ত্রকে বিচার করতে হলে প্রথমেই তাকাতে হয় তার সংসদের দিকে। কারণ সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের স্থান নয়; এটি জাতির বিবেক, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির সর্বোচ্চ মঞ্চ। সংসদ যত প্রাণবন্ত হয়, গণতন্ত্র তত শক্তিশালী হয়; সংসদ যত যুক্তিনির্ভর হয়, রাষ্ট্র তত স্থিতিশীল হয়। আর সংসদ যখন দলীয় প্রশংসার মঞ্চ না হয়ে জনগণের সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, তখনই সংসদীয় গণতন্ত্র তার প্রকৃত সৌন্দর্যে বিকশিত হয়।
পতিত হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির নানা অভিজ্ঞতা পেরিয়ে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশন—বিশেষ করে বাজেট অধিবেশন—দেশের মানুষের সামনে ভিন্ন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করেছে। বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বাদ দিলে সংসদের অধিকাংশ আলোচনায় ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে জনস্বার্থ, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিনিয়োগ, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। সংসদে এমন পরিবর্তনই মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দেয়।
একসময় বাংলাদেশের সংসদে দীর্ঘ সময় ব্যয় হতো দলীয় প্রধানের প্রশংসা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিন্দা কিংবা অতীতের বিরোধ নিয়ে। অথচ সংসদের প্রতিটি মিনিট পরিচালিত হয় জনগণের কষ্টার্জিত করের অর্থে। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে খরচ হয় প্রায় তিন লক্ষ টাকা। যে সময়ে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য, বেকার তরুণের কর্মসংস্থান, হাসপাতালের সংকট, শিক্ষার মান, শিল্পায়ন কিংবা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, সেই সময়ের বড় অংশ যদি গুণকীর্তনে ব্যয় হয়, তাহলে গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়।
তবে আশার কথা হচ্ছে,সাম্প্রতিক সংসদীয় কার্যক্রমে অন্তত একটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দলের বহু সদস্য তাঁদের বক্তব্যে জনগণের বাস্তব সমস্যা, স্থানীয় উন্নয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরছেন। সমালোচনা হচ্ছে, আবার প্রয়োজনে ভালো উদ্যোগের প্রশংসাও করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক সৌজন্যই একটি পরিণত গণতন্ত্রের পরিচয়।
গণতন্ত্র কখনো একমুখী করতালির নাম নয়; গণতন্ত্র হলো প্রশ্ন করার অধিকার, যুক্তি দিয়ে উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এবং মতের ভিন্নতাকে সম্মান করার সংস্কৃতি। সরকার ভুল করলে বিরোধী দল সমালোচনা করবে—এটাই স্বাভাবিক। আবার বিরোধী দল ভালো প্রস্তাব দিলে সরকার সেটি গ্রহণ করবে—এটিও গণতন্ত্রেরই সৌন্দর্য। কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের একার সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।
বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় গণতন্ত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তীব্র রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে তারা একসঙ্গে কাজ করতে পারে। যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতি সপ্তাহে সংসদে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারতের সংসদেও সরকারকে নিয়মিত জবাবদিহি করতে হয়। কখনো বিতর্ক উত্তপ্ত হয়, কিন্তু জাতীয় সংকটে সহযোগিতার পথও খোলা থাকে। বাংলাদেশের সংসদও যদি এই সংস্কৃতিকে স্থায়ী রূপ দিতে পারে, তাহলে গণতন্ত্র আরও গভীর হবে।
সংসদের পরিবেশ অনেকাংশে নির্ভর করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণের ওপর। নেতৃত্ব যখন সংযম, শালীনতা, মিতব্যয়িতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দেয়, তখন তার ইতিবাচক প্রভাব সংসদের ভেতরেও পড়ে। অপ্রয়োজনীয় বক্তৃতা, অহেতুক বিতর্ক এবং ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও নীতিনির্ধারণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সংসদের মর্যাদা তখনই বাড়ে, যখন প্রতিটি বক্তব্যে জনগণের কল্যাণের প্রতিফলন ঘটে।
সংযম, শালীনতা এবং গঠনমূলক সংসদীয় পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব ইতিবাচক ভূমিকা রাখলে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যদি এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে পারেন, তবে তা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তবে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। একটি বা দুটি সফল অধিবেশন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় না। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়নের আগে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংসদ সদস্যদের গবেষণাভিত্তিক বক্তব্য এবং তথ্যনির্ভর বিতর্ক বাড়াতে হবে। কারণ শক্তিশালী সংসদ ছাড়া শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ। জনগণ বিভাজন নয়, ঐক্য চায়; সংঘাত নয়, সহযোগিতা চায়; প্রতিহিংসা নয়, উন্নয়ন চায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য সৃষ্টি করতে না পারলে কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। সংসদই সেই ঐকমত্য তৈরির সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি সংসদ দেখতে চায়, যেখানে কৃষকের কণ্ঠস্বর যেমন গুরুত্ব পাবে, তেমনি তরুণের স্বপ্নও। যেখানে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, নারীর নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু হবে। যেখানে করতালির চেয়ে যুক্তির মূল্য বেশি হবে, আর স্লোগানের চেয়ে সমাধানের গুরুত্ব বেশি হবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, ক্ষমতার সংযমে; বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করায় নয়, তাকে সম্মান দেওয়ায়; ব্যক্তিপূজায় নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করায়। সংসদের প্রতিটি অধিবেশন যদি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের নতুন পথ দেখায়, তাহলে সেটিই হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সংসদ হবে জাতির বিবেকের প্রতিচ্ছবি; যেখানে সরকার ও বিরোধী দল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও শত্রু নয়; যেখানে জাতীয় প্রশ্নে সবাই এক কাতারে দাঁড়াবে। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা একটাই—হানাহানি, বিভেদ ও প্রতিহিংসা কোনো জাতিকে সমৃদ্ধ করেনি। ঐক্য, জবাবদিহি, সহনশীলতা এবং কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রই পারে একটি রাষ্ট্রকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ যদি এই ইতিবাচক ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, তবে এটি কেবল একটি সফল সংসদ হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ গণতন্ত্রের বিজয় মানেই জনগণের বিজয়, আর জনগণের বিজয় মানেই বাংলাদেশের বিজয়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
এইচআর/এমএস








