ধ্বংসোন্মুখ পৃথিবী। বইছে ধূলিঝড়। বাতাস বিষাক্ত। ফসলের খেত পুড়ে ছারখার। না খেয়ে মরছে মানুষ। অথচ সেই চরম সংকটময় সময়ে ভূগর্ভস্থ গোপন দপ্তরে বসে বিজ্ঞানীরা কোটি কোটি ডলার খরচ করে বানাচ্ছেন মহাকাশযান। উদ্দেশ্য, অন্য গ্রহে নতুন বসতি গড়া। এ পটভূমিতে চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র, যিনি একসময়ের বৈমানিক এবং পরে বেছে নিয়েছেন কৃষকের জীবন, আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা যখন বাঁচার জন্য একটুখানি খাবারের খোঁজে মাটির দিকে তাকিয়ে আছি, তোমরা তখন মরিয়া হয়ে তাকিয়ে আছ আকাশের দিকে!’
‘ইন্টারস্টেলার’ চলচ্চিত্রের এই কল্পচিত্র কি আজকের বাস্তবতার জমিন থেকে খুব দূরে?
একদিকে মঙ্গল গ্রহে মানুষের কলোনি বানানোর ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই চিন্তা করতে শুরু করেছে মানুষের মগজের সমান্তরালে। প্রযুক্তি এখন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই মোহনায়, যা আগে কল্পবিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় ছিল।
আর ঠিক এ সময়েই জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে বলছে, বিশ্বের ১৩টি দেশ ও অঞ্চল এখন ‘হাঙ্গার হটস্পট’ বা তীব্র ক্ষুধার কেন্দ্রবিন্দু; যার কয়েকটিতে অচিরেই দুর্ভিক্ষ বা দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল। অর্থাৎ এখনো কোটি কোটি মানুষের আগামীকালের একমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা নেই। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’—কবির এই কথা প্রহসনের মতো মনে হয়!
বৈষম্যের এই রূঢ়-কদর্য রূপটি আরও স্পষ্ট হয় বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস কিংবা মার্ক জাকারবার্গদের দিকে তাকালে। এক ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদই নাকি ট্রিলিয়ন ডলারের ঘর ছুঁয়েছিল। এই বিপুল অর্থের পরিমাপ সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে বললে অত্যুক্তি হয় না। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন ১০ লাখ ডলার করে খরচ করতে থাকেন, তাহলেও এক ট্রিলিয়ন ডলার শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় ২ হাজার ৭৪০ বছর!
গুটিকয় ধনকুবরের বিপুল এই সম্পদের প্রশ্নটি কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; বরং এমন এক ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামোর দলিল, যেখানে সম্পদ জগৎজুড়ে ছড়িয়ে না পড়ে ক্রমে গুটিকয় মানুষের সিন্দুকে জমা হতে থাকে।
এ দুই খবরকে পাশাপাশি রাখলে বুকের ভেতর যে হাহাকার তৈরি হয়, তা কেবল অর্থনৈতিক খতিয়ানের আসমান-জমিন ফারাকের জন্য নয়; বরং এই ফারাকের পেছনের নির্মম কারণটির জন্য। কারণটির হদিস মেলে আমাদের এই তথাকথিত সভ্যতার ‘ময়নাতদন্তে’।
২.
ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, সমাজ-সংসারে বিভেদ-বৈষম্যের শিকড় অনেক গভীরে। শিল্পবিপ্লবের আগেও, যখন দুনিয়াজুড়ে রাজা-বাদশাহ আর সামন্ত প্রভুদের শাসন ছিল, তখনো সাধারণ মানুষের জীবন ছিল শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট। রাজপ্রাসাদের জাঁকজমক, রাজপরিবারের বিলাসিতার রসদের জোগান আসত কৃষকের রক্ত পানি করা খাজনার টাকায়। শাসকের বিলাসী খেয়াল বা যুদ্ধযাত্রার খেসারত দিতে প্রাণ যেত সাধারণ মানুষের।
উনিশ শতকের ইউরোপে এসে এ দৃশ্যপটের শুধু খোলসটা বদলাল। শিল্পবিপ্লব পৃথিবীর বুকে টাকার পাহাড় খাড়া করল ঠিকই, কিন্তু সে পাহাড়ের একচ্ছত্র মালিক বনে গেলেন গুটিকয় পুঁজিপতি। অন্যদিকে কারখানার অন্ধকার কুঠুরিতে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনির পরও শ্রমিকেরা মুক্ত হতে পারলেন না গরিবির বৃত্ত থেকে। এই শোষণ-বৈষম্যই পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা, শ্রমিক আন্দোলন এবং আধুনিক শ্রম-অধিকার আন্দোলনের জন্ম দেয়।
ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়তো আমাদের এই সময়কে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বর্ণযুগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই বলেও ধিক্কার দেবে—সেই যুগে মানুষ কোটি কোটি মাইল দূরের মঙ্গল গ্রহ জয় করার স্বপ্ন দেখছিল বটে, কিন্তু নিজ গ্রহের অভুক্ত মানুষদের জন্য দুমুঠো ভাতের বন্দোবস্ত করতে পারেনি।
কার্ল মার্ক্স ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা ছিলেন না, জাদুকর তো নয়ই; কিন্তু পুঁজিবাদের যে মরণব্যাধি তিনি দেড় শতাব্দী আগে চিহ্নিত করেছিলেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। মার্ক্স তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত স্বভাবই হলো সম্পদকে ক্রমে কেন্দ্রীভূত করা। অর্থ এখানে আরও অর্থকে টানে, আর বৈষম্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে পুনরুৎপাদিত হতে থাকে।
অক্সফামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো যেন মার্ক্সের সেই সতর্কবার্তারই সারাৎসার। প্রতিবেদনগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখাচ্ছে, বিশ্বের মুষ্টিমেয় কয়েকজন ধনীর হাতে পৃথিবীর দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি সম্পদ জমা হয়ে আছে। পৃথিবীতে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয়, তা বর্তমান চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। তবু কোটি কোটি মানুষ তিন বেলা খেতে পায় না। অর্থাৎ সংকটের গোড়ায় উৎপাদন নয়; বরং বণ্টন, সম-অধিকার ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির গবেষণা দেখায়, কীভাবে সম্পদ ক্রমে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে বৈষম্য কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার ফল থাকে না; অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোও তা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে শুরু করে।
ইলন মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ কেন ক্ষতিকর৩.
তবে ইতিহাস আমাদের চোখ বন্ধ রাখতেও নিষেধ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা মাওবাদী চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে—অর্থনৈতিক সমতার ‘মিশনে’ রাষ্ট্র যখন ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারকে উপেক্ষা করে, তখন সে ব্যবস্থাও শেষ পর্যন্ত মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না। আমরা বুঝে যাই—লাগামহীন পুঁজিবাদ যেমন আমজনতাকে চুষে খায়, তেমনি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ‘বোধহীন’ সাম্যবাদও মানুষকে খাঁচায় বন্দী করে।
কিন্তু অতীতের কোনো ব্যবস্থার ব্যর্থতা কি বর্তমান পুঁজিবাদের এই অমানবিক বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়ার লাইসেন্স হতে পারে? একদমই না। বরং প্রশ্নটা আরও আজদাহা আকার নিয়ে সামনে আসে—সভ্যতার আসল গন্তব্য তাহলে কোথায়? গুটিকয় মানুষের সীমাহীন সম্পদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নাকি কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম মর্যাদা কায়েম করা?
ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো লিখেছেন, সমাজের প্রথম ব্যক্তি যিনি একখণ্ড জমি ঘিরে দাবি করেছিলেন, ‘এটি আমার’ এবং অন্যরা তা বিশ্বাস করেছিল, সেখান থেকেই মানবসমাজে কৃত্রিম বৈষম্য, শোষণ ও অপরাধের সূত্রপাত ঘটে। তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তির ঢালাও বিরোধিতা করেননি, বরং মনে করতেন, মানুষের শ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে এর প্রয়োজন রয়েছে। তবে সম্পত্তি যখন মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে অপরের ওপর আধিপত্য ও শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সমাজে চরম বৈষম্য তৈরি হয়।
তবে অনেক আধুনিক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভাবন। কিন্তু মূল প্রশ্নটি সেখানে নয়; প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে কতটা ন্যায্যভাবে পৌঁছাচ্ছে।
রুশোর দুই শতাব্দী পর মার্কিন দার্শনিক জন রলস তাঁর ‘ন্যায্যতার তত্ত্বে’ সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিলেন। বললেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা তখনই সফল, যখন সেই ব্যবস্থার সুফল সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটির ঘরেও পৌঁছায়।
আজ আমরা শেয়ারবাজারের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ‘ফাটকা খেলা’য় যে পরিমাণ টাকা বাতাসে ওড়াই, তার একটা অংশ দিয়ে আফ্রিকা বা এশিয়ার পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর লাখ লাখ মানুষের পুরো বছরের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। অথচ বাস্তবে তা করা হয় না। কারণ, সমস্যাটা তহবিল ঘাটতির নয়, প্রশ্নটা নৈতিক অগ্রাধিকারের। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর গবেষণায় এই পাথরচাপা সত্যই তো আলোয় এনেছেন—আধুনিক যুগে দুর্ভিক্ষ কেবল প্রাকৃতিক কারণে বা খাদ্যের ঘাটতির জন্য হয় না, বরং এটি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা এবং বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতার একটি রাজনৈতিক ফল।
৪.
তাই ইলন মাস্কদের মতো ধনকুবেরদের বিপুল সম্পদের মালিকানা কোনো সাফল্যের রূপকথা নয়; বরং এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ‘ট্রফি’। এটা এমন এক ‘আত্মাহীন’ ব্যবস্থা, যা রকেট বানিয়ে কোটি কোটি মাইল দূরের মহাকাশে পাঠাতে পারে, কিন্তু ফুটপাতের ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে এক লোকমা ভাত তুলে দেওয়ার মতো সংবেদনশীল সমাজ তৈরি করতে পারে না।
সভ্যতা মানে কি কেবল টাইটানিয়াম বডির রকেটে মহাকাশভ্রমণ? চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত কোডিং? নাকি সভ্যতা হলো সেই মানবিক পাটাতন, যেখানে দাঁড়িয়ে এই নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে—‘আজ এই গ্রহে একজন মানুষও না খেয়ে ঘুমাতে যায়নি।’
ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়তো আমাদের এই সময়কে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বর্ণযুগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই বলেও ধিক্কার দেবে—সেই যুগে মানুষ কোটি কোটি মাইল দূরের মঙ্গল গ্রহ জয় করার স্বপ্ন দেখছিল বটে, কিন্তু নিজ গ্রহের অভুক্ত মানুষদের জন্য দুমুঠো ভাতের বন্দোবস্ত করতে পারেনি।
হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহ–সম্পাদক
ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব








