পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে ইউজিসিতে এ বৈঠক হয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন ও করণীয় নিয়ে এ বৈঠক হয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- গবেষণা বাজেট ইউজিসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন থাকবে বলে উপাচার্যদের জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
তিনি বলেন, গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু, কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি গবেষণা বাজেট ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে ইউজিসি।
সভায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব কোডের পরিবর্তে ইউজিসির কোডে গবেষণা বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার ফলে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের স্বায়ত্তশাসনের চর্চা বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- গবেষণা বাজেট একটি নির্দিষ্ট কোডের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ইউজিসি সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে, তবে এ কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গবেষণা খাতে ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ অর্থ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাতে ব্যয় করা হবে। অর্থবছরের শুরুতেই স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণার জন্য প্রস্তাব আহ্বান করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গবেষণা প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে ইউজিসিতে পাঠাবে। পরবর্তীতে জাতীয় অগ্রাধিকার ও গবেষণার গুণগত মান বিবেচনা করে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই গবেষণা বাজেট বাস্তবায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা চাহিদা দ্রুত সংগ্রহ করা হবে এবং প্রস্তাব পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে গবেষণা কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিলম্ব না হয়।
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ইউজিসির মাধ্যমে গবেষণা বাজেট বাস্তবায়ন হলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ কমবে না। বরং আগের বছরের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও বেশি অর্থ পাওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে দেশের আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণা বরাদ্দের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবে এবং কোনো বৈষম্য সৃষ্টি হবে না।
ড. মামুন আহমেদ বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমে মোট ৮৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ৭৯৩ কোটি টাকা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ৫৬ কোটি টাকা পেয়েছে। এ অর্থের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব গবেষণা তহবিল, ইউজিসির গবেষণা অনুদান এবং হিট ও আইসিএসটিইপি প্রকল্পের আওতায় দেওয়া অর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আরও পড়ুন
উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতে জাতীয় নীতি কাঠামো করছে ইউজিসি
ইউজিসি চেয়ারম্যান জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটে গবেষণা খাতে ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে হিট ও আইসিএসটিইপ প্রকল্পের অর্থায়ন যুক্ত হলে চলতি অর্থবছরে গবেষণায় মোট বরাদ্দ প্রায় ৮৫২ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। গবেষণায় অর্থায়নে কোনো সংকট হবে না। বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থায়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, গবেষণায় বরাদ্দকৃত অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেশে একটি সমন্বিত গবেষণা ইকোসিস্টেম এবং জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ, আদান-প্রদান এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পাবে।
ড. মামুন আহমেদ জানান, ইউজিসির বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন এবং ইমপ্রুভিং কম্পিউটার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং টারশিয়ারি এডুকেশন প্রকল্পের আওতায়ও উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন করা হচ্ছে।

সভায় ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. মো. সাইদুর রহমান, অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া দেশের ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, তাদের মনোনীত প্রতিনিধি এবং ইউজিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গবেষণা অর্থায়নে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে এবং দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে ইউজিসি। নতুন সিদ্ধান্ত হলো গবেষণা মঞ্জুরির অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সরাসরি দেওয়া হবে না। এ অর্থ ব্যয় হবে ইউজিসির মাধ্যমে। তবে এ সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকরা অসন্তুষ্ট।
এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল। সংগঠনটির দাবি, গবেষণা তহবিল সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে ইউজিসির মাধ্যমে পরিচালিত হলে গবেষণা কার্যক্রম, একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন এবং গবেষকদের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানায় সাদা দল। পরে ইউজিসির পক্ষ থেকে বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়ার পর এবার ভিসিদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।
এএএইচ/এমআইএইচএস/








