জুলাই আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। আন্দোলনকারীসহ অনেকের কাছে দিনটি ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে পরিচিত। মাত্র মাসখানেকের মধ্যে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন এভাবে রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করবে, এটা সাধারণ মানুষের চিন্তায় ছিল না। কিন্তু ১৫ জুলাই দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যে নারকীয় তাণ্ডব পরিচালিত হয়, সেখানেই মূলত ফ্যাসিবাদী সরকারের চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।

আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের সঙ্গে সারা দেশের চাকরিপ্রত্যাশী তরুণেরা একজোট হন। ২০২৪-এর ১ জুলাই থেকেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংগঠিত করে আন্দোলনের পরিসর বাড়াতে থাকেন। ‘বাংলা ব্লকেড’ নাম দিয়ে প্রথমে তাঁরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। এ সময়ে শিক্ষার্থীরা সরকারের সঙ্গে বসতে চেয়ে কোনো সাড়া পাননি। এমনকি শুরুতে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কোটা সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্তব্যের সূত্র ধরে পরে নিজেদের বক্তব্য পাল্টে ফেলে।

একটি শরীর, একটি বুলেট এবং এক স্বৈরাচারের পতনশেখ হাসিনার পতন ও ইতিহাসের শিক্ষা

১৪ জুলাই আন্দোলনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তখনকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি কথার সূত্র ধরে শিক্ষার্থীরা মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসেন এবং মিছিলে স্লোগান তোলেন ‘তুমি কে আমি কে—রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে—স্বৈরাচার স্বৈরাচার’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য পূর্বনির্ধারিত ছিল কি না, তিনিই ভালো বলতে পারবেন, তবে এর পরদিন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রীতিমতো তাণ্ডব চলে।

১৫ জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা ক্যাম্পাসে অতীতের তাদের যেকোনো সহিংসতাকে হার মানিয়েছে। সেদিনের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড ছিল রীতিমতো ভয়াবহ।

সেদিন বাইরে থেকেও প্রচুরসংখ্যক দলীয় কর্মী ও সন্ত্রাসীকে ক্যাম্পাসে আনা হয়। তারা হকিস্টিক, লাঠি, রড, লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারও কারও হাতে পিস্তলও দেখা যায়।

ঘটনার সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে। সেদিনের আক্রমণের ভয়াবহতা দেখে অন্তত এটা বোঝা গেছে, এই হামলার প্রতিকার ও বিচার না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরবে না।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভরত ছাত্র–জনতার ওপর হামলা চালান আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা। শহীদুল্লাহ হলের সামনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৫ জুলাই। ছবি: সাজিদ হোসেন

এই ঘটনার পেছনে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। ১৫ জুলাই দুপুরে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত শিক্ষার্থীদের রাজাকার পরিচয়-সংশ্লিষ্ট স্লোগান আমাদের জাতীয় মৌলিক চেতনার সঙ্গে ধৃষ্টতার শামিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোটাবিরোধী কতিপয় নেতা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, এর জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত।’ এর পরপরই ছাত্রলীগ ও বাইরে থেকে আসা সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার হামলা চালায়।

২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতেও আন্দোলন হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন সংস্কারের বদলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে কোটা পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন। নতুন আন্দোলন সহিংস প্রক্রিয়ায় দমন করা হবে, এটি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ভাবতে পারেনি।

হাসিনার পতন থেকে নেতারা যে পাঠ নিতে পারেনস্বৈরাচারের পতন হলেই কি গণতন্ত্র ফেরে

পরদিন পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী, ওই দিন তিন শর বেশি মানুষ আহত বা গুরুতর জখম হয়। ক্যাম্পাসে ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে রাখার কারণে ঘটনার নৃশংসতা তাৎক্ষণিকভাবে দেশের মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। দুঃখজনক হলো, ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা হয়।

বলা যায়, ১৫ জুলাইয়ের হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা আন্দোলনে বারুদ জ্বালিয়ে দেয়। পরদিন ১৬ জুলাই দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও প্রবল আকার ধারণ করে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমে আসেন। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ ছয়জন শহীদ হন। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ওই রাতেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৭ জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সব আবাসিক হল থেকে ছাত্রলীগকে বের করে দিয়ে ক্যাম্পাসকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ ঘোষণা করেন।

সেদিন আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের গায়েবানা জানাজার পাশাপাশি তাঁরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। সেখানেও হামলার ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটাব্যবস্থা প্রসঙ্গে আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা আদালতের ‘স্বাধীন’ ভূমিকার ওপর আস্থা রাখতে পারেননি, তাঁরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ডাক দেন।

১৮ জুলাই কমপ্লিট শাটডাউনের প্রথম দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৪১ জন নিহত হন। ওই দিনই সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গেও বাংলাদেশের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯ জুলাই শাটডাউন কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে সংঘাত-সংঘর্ষে আরও অন্তত ৫৬ জন নিহত হন।

এসব হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরাও অংশ নেন। ২০ জুলাই রাতের প্রথম প্রহর থেকে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়। এরপর আন্দোলন আরও দানা বাঁধতে থাকে। পরবর্তী সময়টুকু ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের অপেক্ষা মাত্র।

আওয়ামী সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণ তাদের প্রায় জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। ২০২৪ সালের শুরুতে করা একতরফা নির্বাচন মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূত্র ধরে সাধারণ মানুষ সরকারের দমন-পীড়ন ও অস্ত্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। ১৫ জুলাইয়ের সহিংসতার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন হয়।

এই গণ-অভ্যুত্থান থেকে ভবিষ্যতের ক্ষমতাসীন দলগুলোর শিক্ষা নেওয়ার আছে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা যদি কোনো সরকারকে ফ্যাসিবাদী করে তোলে, তবে জনগণ তার বিরুদ্ধে বুক পেতে দিতে পিছপা হয় না।

  • তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব