দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ আট দশক ধরে জাপান তার শান্তিবাদী সংবিধান এবং যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা ছাতার ওপর ভরসা করে চলেছে। কিন্তু পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন নিরাপত্তার হুমকির মুখে টোকিও এখন তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে।
একসময় অভ্যন্তরীণ দমনের স্মৃতি এবং সামরিকীকরণের আশঙ্কায় গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাখা জাপান এখন গঠন করেছে ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো’ (এনআইবি)। এটিকে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির গোয়েন্দা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক সংস্কার।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল তথ্য আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম নয়; বরং এটি জাপানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ বা যুক্তরাজ্যের এমআই৬-এর মতো পূর্ণাঙ্গ বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা গঠন এবং কঠোর গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী আইন প্রণয়নের একটি কৌশলগত ভিত্তি।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে জাপান এত দিন ‘গোয়েন্দাদের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি নিয়ে কম কটাক্ষের শিকার হতে হয়নি!
যে তিনটি প্রধান কারণে টোকিওর এই সংস্কার অনিবার্য হয়ে উঠেছে:
বিভক্ত গোয়েন্দা কাঠামো: এত দিন জাপানের প্রধান তথ্য সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান ছিল ক্যাবিনেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ অফিস (সিরো)। প্রায় ৭০০ কর্মীর এই সংস্থার কাছে পর্যাপ্ত আইনি কর্তৃত্ব ছিল না। এ ছাড়া পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, বিচার মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পুলিশ বাহিনীর স্ব-স্ব গোয়েন্দা বিভাগ থাকলেও তাদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করার বাধ্যবাধকতা ছিল না।
আইনি ফাঁকফোকর: জাপানে কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টি-স্পাই বা গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী আইন না থাকায় বিদেশি এজেন্টরা চরম সংবেদনশীল বাণিজ্যিক ও সামরিক তথ্য সহজে সংগ্রহ করতে পারত, যা কঠোরভাবে আইনি দণ্ডের আওতায় আনা কঠিন ছিল।
প্রযুক্তি ও সামরিক তথ্য পাচার: অতি সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে জাপানি যন্ত্রাংশ পাচারের গোয়েন্দা তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে ফাঁস হলে টোকিওর নিরাপত্তা কাঠামোর মারাত্মক দুর্বলতা উন্মোচিত হয়।
নতুন গঠিত ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো’ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল’-এর অধীনে থেকে প্রতিটি সরকারি ও সামরিক দপ্তরকে বাধ্যতামূলকভাবে একক তথ্যের আওতায় নিয়ে আসবে।
এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামোতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থেকে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (এনআইবি) মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় পুলিশ বাহিনীর আলাদা গোয়েন্দা ইউনিটগুলোকে এখন থেকে এনআইবি-র সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে তথ্য শেয়ার করতে হবে।
টোকিওর সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের পেছনে কাজ করছে বেইজিং, মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার নজিরবিহীন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সংহতি। চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া, প্রযুক্তি বিনিময় এবং ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনাদল পাঠানোর মতো ঘটনা উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।
এ ছাড়া জাপানে প্রায় ৫৫ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। তাইওয়ান প্রণালি বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক উত্তেজনায় মার্কিন প্রযুক্তি ও কৌশলের গোপনীয়তা রক্ষা করা জাপানের জন্য আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেই সঙ্গে রয়েছে মিত্রদের কৌশলগত চাপ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা মিত্রদের বার্তা পরিষ্কার—তথ্য সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক নিশ্চয়তা না দিলে তারা টোকিওর সঙ্গে গভীর সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে না।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনে ১৯৮৩ সালে একই ধরনের অ্যান্টি-স্পাই আইন প্রবর্তনের চেষ্টা করে নাগরিক ক্ষোভের মুখে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চলতি বছরের নির্বাচনে আইনসভার প্রতিনিধি পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর রক্ষণশীল এই রাজনীতিকের সামনে শান্তিবাদী সংবিধান পরিবর্তন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার পথ সুগম হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় পশ্চিমা মিত্রদের পরামর্শে টোকিও দ্রুত আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত করছে।
গোয়েন্দা সংস্কারের প্রক্রিয়াটি মসৃণ হলেও এর অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানের সামরিক জান্তা যেভাবে ‘কেমপেইতাই’ (সামরিক পুলিশ) ও গোয়েন্দা সংস্থাকে নাগরিকদের অধিকার হরণ ও রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে ব্যবহার করেছিল, সেই স্মৃতি জাপানি সমাজে এখনো গভীর আতঙ্ক তৈরি করে।
বিরোধী দল কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা মাকোতো ওনিকিসহ মানবাধিকার কর্মীরা মূলত তিনটি বিষয়ে তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তাঁরা বলছেন—
-উপযুক্ত চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা বিচার বিভাগীয় তদারকি ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাকে অসীম ক্ষমতা দিলে তা নজরদারির রাষ্ট্রে রূপ নিতে পারে।
-বিরোধী দল ও সমালোচকদের দমনে সরকারের এই ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
-যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সংসদীয় কমিটি বা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজের ওপর সুনির্দিষ্ট নজরদারি থাকে, যা জাপানের নতুন কাঠামোতে অনুপস্থিত।
সর্বোপরি, জাপানের এই পদক্ষেপ কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের এক বিশাল প্রতিফলক। বাস্তবতার নিরিখে জাপান গোয়েন্দা কাঠামোর আধুনিকায়ন করলেও, গণতান্ত্রিক তদারকি ও নাগরিক স্বাধীনতার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করবে—তার ওপরই নির্ভর করবে আধুনিক টোকিও এক ভারসাম্যপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হবে, নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে পড়বে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন







