আমাদের সমাজে একজন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর খুব বেশি সময় লাগে না—কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর মূল্যায়ন শুরু হয়ে যায়।

‘কী করেন?’

প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু এর পরের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—

‘মাসে কত আয় করেন?’

এই প্রশ্নটি সাধারণত সরাসরি করা হয় না। একটু ভদ্র সমাজে ঘুরিয়ে করা হয়। ‘ব্যবসা কেমন চলছে?’ ‘বেতন নিশ্চয়ই ভালো?’ ‘নিজের বাড়ি আছে?’ ‘গাড়ি কেমন?’ ‘ছেলেমেয়েরা কোথায় পড়ে?’

সব প্রশ্নের শেষ গন্তব্য একটাই—আপনার আর্থিক অবস্থান কতটা ভালো?

আমরা কি মানুষকে তার আয় দিয়ে মাপি?

মনে হয়, অনেকটাই।

একজন মানুষ মাসে এক লাখ টাকা আয় করেন। আরেকজন মাসে দশ লাখ। সমাজের চোখে দ্বিতীয়জনের গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তিনি বেশি সফল, বেশি বুদ্ধিমান, বেশি সম্মানিত—এমন একটি ধারণা আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

আজকের সমাজে শিশুরাও এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বড় হচ্ছে। তারা খুব ছোট বয়সেই শিখে যাচ্ছে—কোন পেশায় কত টাকা। একজন শিশু হয়তো বলছে, ‘আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।’ একটু পর জিজ্ঞেস করছে, ‘ডাক্তার হলে কত টাকা আয় করা যায়?’ অর্থাৎ পেশা এখন শুধু স্বপ্ন নয়; এটি আয়-ব্যয়ের হিসাবও।

অবশ্য আয় গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ ছাড়া জীবন চলে না। ভালো আয় মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ করে। পরিবার চালাতে, সন্তানকে পড়াতে,

চিকিৎসা করাতে অর্থ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সাফল্যকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন আমরা অর্থকে মানুষের একমাত্র পরিচয় বানিয়ে ফেলি।

একজন মানুষের ব্যাংক হিসাবের পরিমাণ কি তাঁর হৃদয়ের পরিমাণও নির্ধারণ করে?

একজন মানুষ কত টাকা উপার্জন করেন, তা জানা সহজ। কিন্তু তিনি কতজনকে সাহায্য করেছেন, কতটা সৎ, কতটা দায়িত্বশীল, কত মানুষের জীবন বদলেছেন—এসবের হিসাব রাখা কঠিন।

তাই সমাজ সহজ পথ বেছে নিয়েছে।

টাকা আছে? সফল।
টাকা কম? নিশ্চয়ই ব্যর্থ।
এখানেই আমাদের ভুল।

একজন চিকিৎসক হয়তো প্রতিদিন অসংখ্য রোগী দেখেন। তাঁর আয় হয়তো একজন বড় ব্যবসায়ীর মতো নয়। কিন্তু তিনি কত মানুষের জীবন বাঁচালেন, তার হিসাব কে রাখে?

একজন শিক্ষক হয়তো জীবনের বড় অংশ কাটিয়ে দিলেন শ্রেণিকক্ষে। তাঁর মাসিক আয় সীমিত। কিন্তু তাঁর ছাত্রদের মধ্যে কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ প্রশাসক। সেই শিক্ষক কি কম সফল?

একজন কৃষক হয়তো কখনো পাঁচতারা হোটেলে খেতে যাননি। তাঁর ব্যাংক হিসাবও হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু তাঁর শ্রমে দেশের কোটি মানুষ খাবার পায়। তাঁকে আমরা কতটা সম্মান করি?

একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রতিদিন ভোরে উঠে শহর পরিষ্কার করেন। তাঁর আয় সীমিত। কিন্তু তিনি একদিন কাজ না করলে শহরের মানুষ বুঝতে পারে তাঁর কাজের মূল্য কত বেশি।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা অনেক সময় একজন মানুষের কাজের গুরুত্ব বুঝি তখনই, যখন সেই কাজটি আর কেউ করে না।
একজন মানুষ কত আয় করেন—এটি তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থার পরিমাপ হতে পারে। কিন্তু তাঁর মানবিক মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না।

তবু আমাদের সমাজে অর্থের সঙ্গে সম্মানের সম্পর্ক এত গভীর যে অনেক সময় মানুষ নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে পেশার চেয়ে আয়কে বড় করে দেখেন।

‘আমি শিক্ষক’—এই পরিচয়ের চেয়ে ‘আমি মাসে এত টাকা আয় করি’—এই পরিচয় যেন বেশি আকর্ষণীয়।
বিয়ের বাজারে তো বিষয়টি আরও স্পষ্ট।

ছেলের চরিত্র কেমন? দায়িত্বশীল কি না? মানুষের প্রতি তাঁর আচরণ কেমন? সে সৎ কি না?

এসব প্রশ্নের আগে অনেক সময় প্রশ্ন আসে—
‘চাকরি কী?’
‘বেতন কত?’
‘নিজের বাড়ি আছে?’
‘গাড়ি আছে?’

ছেলের চরিত্রের মূল্য আছে, তবে আয়টি একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মেয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাঁর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন আসে—‘কী করেন?’ তারপর ‘কত আয়?’

এমনকি বন্ধুত্বেও অর্থের প্রভাব আছে। কার সঙ্গে ওঠাবসা করলে সামাজিক মর্যাদা বাড়বে, কার সঙ্গে ছবি তুললে পরিচিতি বাড়বে—এসব হিসাবও চলে।

সমাজে যেন মানুষ নয়, মানুষটির সঙ্গে থাকা সুযোগের মূল্য বেশি।

কেউ বড় পদে থাকলে তাঁর চারপাশে মানুষের ভিড় হয়। পদ চলে গেলে সেই ভিড়ও কমে যায়। কেউ ধনী হলে তাঁর বাড়িতে অতিথির অভাব হয় না। ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে অনেক ফোন নীরব হয়ে যায়।

টাকা অনেক সম্পর্ক তৈরি করে। কিন্তু সব সম্পর্ক টাকার বাইরে টিকে থাকে না।

এখানে একটি মজার বিষয় আছে। আমরা মুখে বলি, ‘টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।’

কিন্তু কারও নতুন গাড়ি দেখলে আমরা খুশি হই, নতুন বাড়ি দেখলে মুগ্ধ হই, বড় পদ দেখলে সম্মান করি। অর্থাৎ কথায় আমরা অর্থকে ছোট করি, কাজে অর্থের সামনে মাথা নত করি।

আমাদের সমাজে দরিদ্র মানুষকে আমরা প্রায়ই পরামর্শ দিই—‘পরিশ্রম করলে সফল হওয়া যায়।’

কথাটি সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবাই সমান সুযোগ নিয়ে শুরু করে না। কেউ জন্ম থেকেই ভালো শিক্ষা, নিরাপদ পরিবার, সামাজিক যোগাযোগ ও আর্থিক সহায়তা পায়। কেউ শুরু করে শূন্য থেকে। কেউ ঋণ নিয়ে পড়াশোনা করে, কেউ সংসার চালাতে গিয়ে পড়াশোনা ছাড়ে।

তাই শুধু আয় দেখে মানুষকে বিচার করা অন্যায়।

কারও কম আয় তাঁর অযোগ্যতার প্রমাণ নয়। আবার কারও বেশি আয় তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণও নয়।

অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা খুব বেশি আয় করেন না, কিন্তু খুব ভালো মানুষ। আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁদের আয় বিপুল, কিন্তু তাঁদের আচরণে মানবিকতার অভাব।

অর্থনৈতিক সাফল্য এবং নৈতিক সাফল্য একই জিনিস নয়।

এ কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি।

আজকের সমাজে শিশুরাও এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বড় হচ্ছে। তারা খুব ছোট বয়সেই শিখে যাচ্ছে—কোন পেশায় কত টাকা। একজন শিশু হয়তো বলছে, ‘আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।’ একটু পর জিজ্ঞেস করছে, ‘ডাক্তার হলে কত টাকা আয় করা যায়?’ অর্থাৎ পেশা এখন শুধু স্বপ্ন নয়; এটি আয়-ব্যয়ের হিসাবও।

অবশ্য শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি আমরা তাকে শুধু অর্থের হিসাব শেখাই, তাহলে সে একদিন হয়তো অনেক টাকা আয় করবে; কিন্তু জীবনের মূল্য বুঝবে না।

আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে—অর্থ উপার্জন করো, কিন্তু অর্থের দাস হয়ো না। সফল হও, কিন্তু অন্যকে ছোট করে নয়। বড় হও, কিন্তু মানুষ হিসেবে ছোট হয়ে নয়।

সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে।

একজন মানুষকে তাঁর পোশাক, গাড়ি, বাড়ি বা ব্যাংক হিসাব দিয়ে বিচার না করে তাঁর কাজ ও চরিত্র দিয়ে মূল্যায়ন করা দরকার। একজন শ্রমজীবী মানুষ যেন সম্মান পান। একজন শিক্ষক যেন তাঁর পেশার জন্য গর্বিত হতে পারেন। একজন সৎ কর্মচারী যেন মনে না করেন, সততার কারণে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন।

আমরা যদি ভালো মানুষকে সম্মান না করি, তাহলে সমাজে ভালো থাকার প্রেরণা কমে যাবে।

অর্থের মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু অর্থকে সবকিছুর মাপকাঠি বানানো বিপজ্জনক। কারণ টাকা দিয়ে বাড়ি কেনা যায়, কিন্তু ঘর পাওয়া যায় না। চিকিৎসা কেনা যায়, কিন্তু স্বাস্থ্য সবসময় নয়। বিলাসিতা কেনা যায়, কিন্তু শান্তি নয়। পরিচিতি কেনা যায়, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, টাকা দিয়ে মানুষের চরিত্র কেনা যায় না।

একজন মানুষ কত টাকা রেখে গেলেন—এটি তাঁর সম্পদের হিসাব। কিন্তু তিনি কত মানুষের মনে জায়গা করে গেলেন—এটি তাঁর জীবনের হিসাব।

এই দুই হিসাব এক নয়।

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা খুব বেশি অর্থ রেখে যাননি; কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর পর অসংখ্য মানুষ কেঁদেছেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁদের সম্পদের পরিমাণ বিপুল; কিন্তু তাঁদের চলে যাওয়ার পর সমাজে কোনো শূন্যতা তৈরি হয়নি।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তার সম্পদ দিয়ে নয়, তার প্রভাব দিয়ে বড় হয়।
আমাদের তাই প্রশ্নটি বদলাতে হবে।

‘আপনি কত আয় করেন?’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি জিজ্ঞেস করা উচিত—

‘আপনি কতটা সৎ?’

‘আপনি কতজনের উপকার করেছেন?’

‘আপনার কারণে পৃথিবী কি একটু ভালো হয়েছে?’

‘আপনার পাশে থাকা মানুষগুলো কি আপনাকে বিশ্বাস করে?’

‘আপনার সন্তান কি আপনার অর্থের জন্য গর্বিত, নাকি আপনার চরিত্রের জন্য?’

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো ব্যাংক স্টেটমেন্টে পাওয়া যাবে না। কিন্তু মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন সেখানেই।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন ধনী মানুষ তাঁর সম্পদের জন্য সম্মান পাবেন, কিন্তু একজন কম আয়ের মানুষ তাঁর সততা, শ্রম ও মানবিকতার জন্যও সমান সম্মান পাবেন।

যেখানে একজন মানুষকে দেখে প্রথম প্রশ্ন হবে না—‘কত টাকা আছে?’
বরং প্রশ্ন হবে—
‘মানুষটি কেমন?’

কারণ টাকা মানুষের জীবনকে স্বচ্ছন্দ করতে পারে, কিন্তু মানুষকে মহৎ করে না। পদ মানুষকে ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু মর্যাদা নয়। বড় বাড়ি মানুষকে জায়গা দিতে পারে, কিন্তু বড় হৃদয় নয়।

একদিন আমাদের সবার আয়, পদ, গাড়ি, বাড়ি—সবকিছুই পেছনে পড়ে থাকবে। তখন মানুষ মনে রাখবে আমরা কত টাকা উপার্জন করেছি, নাকি আমরা কেমন মানুষ ছিলাম—সেটিই হবে আসল প্রশ্ন।

তাই আয় থাকুক, সাফল্য থাকুক, সম্পদ থাকুক—সবই প্রয়োজন। কিন্তু মানুষকে মাপার দাঁড়িপাল্লায় যেন শুধু টাকা না থাকে।
কারণ যে সমাজে মানুষের মূল্য তার আয়ে নির্ধারিত হয়, সেখানে দরিদ্র মানুষ শুধু অর্থে দরিদ্র থাকে না—সম্মানেও দরিদ্র হয়ে পড়ে।
আর যে সমাজে একজন মানুষের মূল্য তার মানবিকতায় নির্ধারিত হয়, সেখানে কম আয় করা মানুষও মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের আসল উন্নতি তার ধনীদের সংখ্যা দিয়ে নয়, তার সাধারণ মানুষের মর্যাদা দিয়ে মাপা উচিত।

আমরা কি সেই সমাজ তৈরি করতে পারব—যেখানে মানুষকে জিজ্ঞেস করার আগে, ‘আপনি কত আয় করেন?’ আমরা একবার ভাবব—‘আপনি কেমন মানুষ?’

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ
[email protected]

এইচআর/এএসএম