বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে গরম ভাতের সুবাস, কিন্তু আজ সেই সুবাসে যেন ভাটা পড়েছে আগুনের অভাবে। সম্প্রতি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অগ্নিকাণ্ডের ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় পুরো বাংলাদেশ এক তীব্র সংকটকাল অতিক্রম করছে।

রান্নাঘরের নিভে যাওয়া উনুন থেকে শুরু করে কলকারখানার নিষ্প্রাণ চাকা—সবখানেই এখন হাহাকার। ৩০ জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের দৈনিক ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ২,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও কম। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের এক বিশাল পর্বত। অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব রক্ষায় এই জাতীয় সমস্যাটির গভীরতা অনুধাবন করে এর একটি টেকসই এবং সুদূরপ্রসারী সমাধান খোঁজা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ঢাকা বিভাগের জনবহুল জেলাগুলোয় বর্তমানে রান্নার গ্যাস যেন অমাবস্যার চাঁদ হয়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকার মিরপুর ও পুরান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ ও ফতুল্লা এবং গাজীপুর জেলার শ্রীপুর ও কোনাবাড়ী শিল্পাঞ্চলের বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআইয়ে, যেখানে স্বাভাবিক রান্নার জন্য প্রয়োজন অন্তত ৮ পিএসআই। তীব্র গ্যাস-সংকটে তিতাস গ্যাস বিতরণ অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহক এখন গভীর রাতে জেগে থাকছেন শুধু পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার আশায়। অন্যদিকে সাভার ও ধামরাই উপজেলার তৈরি পোশাক কারখানাগুলোয় গ্যাস-সংকটের কারণে তাদের উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

চট্টগ্রামে গ্যাস-সংকট এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির আওতাধীন চট্টগ্রাম মহানগরী, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার শিল্পাঞ্চলগুলোয় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইস্পাত ও সার কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় অবস্থিত এলএনজি টার্মিনালটির আকস্মিক বিকলতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিকটবর্তী ফেনী ও কুমিল্লার লাকসাম এবং চৌদ্দগ্রামের সিএনজি স্টেশনগুলোর ওপর। শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও গণপরিবহন জ্বালানির আশায় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে দিন পার করছে, যা শুধু মানুষের কর্মঘণ্টাই নষ্ট করছে না, বরং স্থানীয় পরিবহনভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে।

খুলনা বিভাগের গ্যাস-সংকট এখন সাধারণ মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাখরাবাদ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যাস নেটওয়ার্কের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই বিভাগের বিশেষ করে কুষ্টিয়ার কুমারখালী এবং যশোরের অভয়নগর উপজেলার টেক্সটাইল মিলগুলো গ্যাস-সংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গৃহিণীরা সিলিন্ডার গ্যাসের দিকে ঝুঁকলেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ১,৩০৬ টাকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কালোবাজারে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকেরা। সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের প্রান্তিক উপজেলাগুলোয়ও রান্নার বিকল্প হিসেবে মানুষ লাকড়ি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে। পাবনার ঈশ্বরদী ইপিজেডের একাধিক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসের চাপ সংকটের কারণে দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না, যা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির আওতাধীন এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস না পাওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকেছে।

রংপুর বিভাগের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং উদীয়মান শিল্প খাতও এই তীব্র জ্বালানিসংকটের তপ্ত নিশ্বাস থেকে রেহাই পায়নি। দিনাজপুরের পার্বতীপুর ও পীরগঞ্জের চালকলগুলো ব্র্যান অয়েল ও চাল শুকানোর প্রক্রিয়ায় গ্যাসের তীব্র অভাব বোধ করছে।

বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোয় এখনো পাইপলাইনের গ্যাস পুরোপুরি না পৌঁছালেও এলপিজি সংকটের কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন এবং দৌলতখান উপজেলায় প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত থাকলেও তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকায় স্থানীয়রা এর সুফল পাচ্ছেন না। বরিশাল সদর এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লঞ্চ ও নৌপরিবহন চালিত ব্যবসাগুলোয় পরোক্ষ জ্বালানিসংকটের কারণে মালামাল পরিবহনের খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গ্যাস-সংকটের কারণে বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার হিমায়িত মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোর পণ্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সিলেট বিভাগ দেশের প্রধান গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে নিজেদের এলাকাতেই সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলার ব্যাপক বিস্তৃত স্পিনিং ও নিটওয়্যার কারখানাগুলো গ্যাস-সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করতে পারছে না।

সার্বিকভাবে বাংলাদেশের আটটি বিভাগের প্রতিটি জেলাই আজ এই অদৃশ্য জ্বালানি দানবের কবলে পড়ে নীল হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সারা দেশে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে, যা দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে আমাদের প্রথম করণীয় হলো মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ত্রুটিপূর্ণ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউগুলোর দ্রুত এবং স্থায়ী সংস্কার নিশ্চিত করা। একটি সিঙ্গেল টার্মিনাল বিকল হলে পুরো দেশ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, এমন অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে একটি সার্বক্ষণিক কারিগরি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যারা যেকোনো আপৎকালীন যান্ত্রিক ত্রুটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করতে সক্ষম হবে। কেবল আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর ভরসা না করে এই পরিকাঠামোকে বহুমুখী ও টেকসই করা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের ভূখণ্ডে লুকিয়ে থাকা নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে বাপেক্সকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে শক্তিশালী করতে হবে। স্থলভাগের পুরোনো ও পরিত্যক্ত কূপগুলো পুনরায় খনন বা ‘ওয়ার্কওভার’ করার মাধ্যমে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। বঙ্গোপসাগরের বিশাল ব্লকে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন করা হলে একদিকে যেমন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের ওঠানামা থেকে দেশ সুরক্ষিত থাকবে।

গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের অপচয় রোধে শতভাগ প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। দেশের বহু এলাকায় অবৈধ গ্যাস-সংযোগের মাধ্যমে কোটি কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির রক্তক্ষরণের শামিল। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে একটি কঠোর টাস্কফোর্স গঠন করে এই অবৈধ লাইনগুলো চিরতরে বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

দেশের কলকারখানা ও পোশাকশিল্পের চাকা সচল রাখতে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নীতি প্রণয়ন করতে হবে। রপ্তানিমুখী শিল্প খাত যেমন টেক্সটাইল, ওষুধ এবং সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনে সিএনজি স্টেশনগুলোর রেশনিং সময় আরও বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তার জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবিত হতে হবে। দেশের শিল্পকারখানাগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল বা ‘রুফটপ সোলার’ স্থাপনে ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ এবং শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা প্রদান করা উচিত।

দেশের বাজারে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার যে উৎসব চলছে, তা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী ‘জাতীয় জ্বালানি মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে জ্বালানি খাতকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে সম্পূর্ণ পেশাদারত্বের সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।