চট্টগ্রামে এবার বর্ষার আগেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। পরিস্থিতি সামাল দিতে নগরীর আটটি এলাকাকে হটস্পট ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন অফিস। ২০২৩ সালে সর্বাধিক সংখ্যক আক্রান্ত ও রেকর্ড মৃত্যু মাথায় রেখে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।

পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে এডিস মশার মূল প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। পাশাপাশি মাসজুড়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ১৪ হাজার ৮৭ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে মারা যান ১০৭ জন। ২০২২ সালে মারা যান ৪১ জন। আক্রান্ত ছিল ৫ হাজার ৪৪৫ জন।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি পুরুষ, মৃত্যু বেশি নারীর

তবে ২০২৩ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৩২৩ জন ডেঙ্গু রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়। ওই বছর ডেঙ্গুতে মারা যান ৪৫ জন। ২০২৫ সালে আগের বছরের চেয়ে কিছুটা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মারা যান ২৭ জন। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন।

চট্টগ্রামের চার হাসপাতালে ১১ রোগী চিকিৎসাধীন

সিভিল সার্জন অফিসের ২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ২৪৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নগরীতে ১১৮ জন এবং জেলার ১৫ উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ১২৯ জন।

এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে একজন মারা যান। তাছাড়া চট্টগ্রামের বাইরের জেলায় আক্রান্ত হওয়া ৭০ জন রোগী রেফার হয়ে চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছেন।

উপজেলার মধ্যে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে সীতাকুণ্ড উপজেলায়। পাশাপাশি পটিয়ায় ১৪ জন, রাউজান ও মীরসরাইয়ে ১৩ জন করে ও বাঁশখালীতে ১০ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গুতে জীবন যায় সচেতনতাই বাঁচার উপায়

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক দপ্তরের তথ্য বলছে, ২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল, ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি ও একটি প্রাইভেট ক্লিনিকসহ চার হাসপাতালে ১১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন।

নগরীতে ৮ এলাকাকে হটস্পট ঘোষণা

চট্টগ্রাম মহানগরীর জালালাবাদ (২ নম্বর ওয়ার্ড), পাঁচলাইশ (৩ নম্বর ওয়ার্ড), উত্তর কাট্টলী (১০ নম্বর ওয়ার্ড), পশ্চিম বাকলিয়া (১৭ নম্বর ওয়ার্ড), দক্ষিণ বাকলিয়া (১৯ নম্বর ওয়ার্ড), পাথরঘাটা (৩৪ নম্বর ওয়ার্ড), দক্ষিণ হালিশহর (৩৯ নম্বর ওয়ার্ড) ও দক্ষিণ পতেঙ্গাকে (৪১ নম্বর ওয়ার্ড) ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা সিভিল সার্জন অফিস।

হটস্পট

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের সবগুলো উপজেলা হাসপাতাল প্রধানদের নিয়ে আমরা মিটিং করেছি। নগরীতেও মেয়র সাহেবের সভাপতিত্বে একটি মিটিং হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর মিলে আমরা একটি এন্টমোলজিক্যাল সার্ভে (কীটতত্ত্ব জরিপ) করেছি।’

কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোন এলাকায় লার্ভা বেশি, কোন এলাকায় মশায় ডেঙ্গুর সম্ভাবনা বেশি, এসব বিষয়গুলো নিয়ে সার্ভেটি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সিভিল সার্জন বলেন, ‘এর ওপর ভিত্তি করে নগরীর আটটি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বায়েজিদ, পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, আন্দরকিল্লা, হালিশহর, বাকলিয়াসহ এলাকাগুলোতে বিশেষ করে মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য আমরা চিঠি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি। বিগত বছরের তুলনায় এবার রোগীর সংখ্যা কম। এটা আশাব্যঞ্জক। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাসগুলোতে আমাদের রোগী ছিল ৩০ জনের নিচে।’

পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলো টার্গেট

ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নগরীর আট এলাকার হটস্পটগুলোতে এডিশ মশা চিহ্নিত করতে পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলো টার্গেট করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম (মাহি) জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্ষার আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। মাসজুড়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চলবে। পাশাপাশি নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডেই মশক নিধনের জন্য সকালে লার্ভিসাইড ও বিকেলে ফগিং বা অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানোর কাজ ত্বরান্বিত করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন

শিশুর ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ কী কী ও কখন হাসপাতালে নেবেন?

চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে এডিস মশার বিস্তার রোধে পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে টার্গেট করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কারণ পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে জমে থাকা পানিতে এডিশ মশার বিস্তার হয় বলে জানান তিনি।

মো. সরফুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব নির্মাণাধীন ভবন দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, বর্ষাকালে সেখানেও পানি জমে মশার লার্ভা তৈরি হয়। তাই এ ধরনের ভবনগুলোতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। হটস্পটগুলোতে কাজ করার জন্য আমরা ৬০ জনের প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে একটি টিম গঠন করেছি।’

হটস্পগুলোতে সার্ভে চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডটিতে আমরা ৩০টির মতো পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবন পেয়েছি। তবে যেগুলো ব্যবহার হয় না, সেগুলোর দিকে আমরা নজর দিচ্ছি। এখানে পুরো নগরীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য আমরা একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট’ নিয়েছি।’

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণের ঘরোয়া ৫ উপায় জেনে রাখুন

যেখানে রোগী পাওয়া যাবে, তার আবাসস্থলের ৬শ মিটারের মধ্যে সকাল-বিকেল রুটিন করে মশার ওষুধ স্প্রে করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

মাসজুড়ে সচেতনতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে কথা হয় চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন রানার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুদিন আগে মেয়রের সভাপতিত্বে আমরা সমন্বয় সভা করেছি। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুর জন্য আলাদা একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আইসোলেশন ওয়ার্ডে সেবা চালু করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘চসিক স্বাস্থ্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কর্নার চালু রয়েছে। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে পুরো শহরে মাইকিং ও তথ্যবহুল লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম চলছে।’

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার খোলা হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে স্যালাইনসহ আনুষঙ্গিক ওষুধ।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়গুলোতেও সচেতনতা বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে কোনো অবস্থায়ই যেন রোগীরা ঘরে বসে না থাকেন। আমরা সচেতনতা তৈরির জন্য ঝটিকা অভিযান চালাচ্ছি। ইতোমধ্যে ডেঙ্গু সচেতনতার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম কারাগারও পরিদর্শন করেছি।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/ এমএফএ